দৃষ্টিনন্দন লাল-নীল-হলুদ পালকের জন্য পরিচিত স্কারলেট ম্যাকাও। কিন্তু এই আকর্ষণীয় পাখিটির বংশবিস্তারের পথে রয়েছে এক অদ্ভুত বাধা—অনেক ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের মা-বাবাই সবচেয়ে ছোট ছানাটিকে খাবার দেওয়া বন্ধ করে দেয়। ফলে অনাহারে মারা যায় ছানাগুলো।
এবার এমন ছানাদের বাঁচাতে তাদের বাসা থেকে উদ্ধার করে অন্য স্কারলেট ম্যাকাও দম্পতির কাছে তুলে দিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। বন্য পরিবেশেই ‘পালক বাবা-মা’র কাছে বড় করার এই পদ্ধতিতে আশাব্যঞ্জক সাফল্য পাওয়া গেছে।
কেন ছোট ছানাকে খাবার দেয় না মা-বাবা?
স্কারলেট ম্যাকাও সাধারণত এক মৌসুমে সর্বোচ্চ চারটি ডিম পাড়তে পারে। কিন্তু সব ছানা বড় হয়ে উড়তে পারে না। গবেষণায় দেখা গেছে, দ্বিতীয় ছানার প্রায় এক-চতুর্থাংশ এবং তৃতীয় ও চতুর্থ ছানার অধিকাংশই উড়তে শেখার আগেই মারা যায়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর পেছনে খাবারের অভাবই প্রধান কারণ নয়। বরং ছানাগুলোর জন্মের সময়ের ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ও পরের ছানার মধ্যে চার-পাঁচ দিন বা তার বেশি ব্যবধান হলে তাদের প্রয়োজনীয় যত্নের ধরনও আলাদা হয়ে যায়।
একটি ছানা যখন নিয়মিত খাবার চাইছে, তখন অন্যটি হয়তো এখনো এমন পর্যায়ে থাকে যখন তার শরীরের তাপমাত্রা ধরে রাখতে বেশি সময় তাৎক্ষণিক উষ্ণতা দরকার। ফলে মা-বাবার পক্ষে ভিন্ন বয়সের একাধিক ছানাকে সমানভাবে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।
‘ব্রুড রিডাকশন’—প্রকৃতির কঠিন নিয়ম
পাখিদের মধ্যে ছানাদের একটি অংশকে টিকতে না দেওয়ার ঘটনা নতুন নয়। জীববিজ্ঞানে এ ধরনের আচরণকে brood reduction বলা হয়। সীমিত সম্পদের পরিবেশে কিছু ছানাকে বাঁচিয়ে বাকিদের বাদ দেওয়ার মাধ্যমে মা-বাবা অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ছানাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।
স্কারলেট ম্যাকাওয়ের ক্ষেত্রে গবেষকরা দেখেছেন, ছোট ছানাদের প্রতি অবহেলা কখনো এতটাই চরম হয় যে মা পাখি তাদের নিজের শরীরের উষ্ণতাও দেওয়া বন্ধ করে দেয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাসার উপকরণ দিয়ে ছানাটিকে ঢেকে দেওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে। তবে বিজ্ঞানীরা প্রাণীর আচরণকে মানুষের নৈতিকতার মানদণ্ডে বিচার না করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন।
বাঁচানোর নতুন কৌশল
পেরুর আমাজনে দীর্ঘদিন স্কারলেট ম্যাকাও নিয়ে গবেষণা করা বিজ্ঞানী গ্যাব্রিয়েলা ভিগো-ট্রাউকো এবং তাঁর সহকর্মীরা এই সমস্যার সমাধানে বন্য পাখিকেই ‘পালক মা-বাবা’ হিসেবে ব্যবহার করার উদ্যোগ নেন।
২০১৮ সালে ‘পার্কার’ নামে একটি ছানাকে তার বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়। তখনও তার চোখ খোলেনি এবং সে ছিল দুর্বল ও কম ওজনের। বিজ্ঞানীরা প্রথ
মে তাকে প্রায় তিন সপ্তাহ হাতে খাবার দেন। এরপর একই বয়সের বা অপেক্ষাকৃত উপযুক্ত ছানা থাকা অন্য একটি ম্যাকাও পরিবারের বাসায় তাকে স্থানান্তর করা হয়।
নতুন মা পাখিটি পার্কারকে গ্রহণ করে। কয়েক মাস পর সে বাসা ছেড়ে উড়তেও সক্ষম হয়। গবেষকদের কয়েক দশকের পর্যবেক্ষণে তামবোপাতা অঞ্চলে এটিই ছিল চতুর্থ ছানা হিসেবে সফলভাবে উড়ে যাওয়ার প্রথম ঘটনা।
২৫ ছানার সফলতা
২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে গবেষকরা মোট ২৮টি ছানাকে অন্য বাসায় স্থানান্তর করেন। গবেষণা-সারাংশ অনুযায়ী, স্থানান্তর করা ছানাদের প্রায় ৮৯ শতাংশ সফলভাবে বাসা ছেড়ে উড়তে সক্ষম হয়।
এই পদ্ধতির ফলে প্রতি বাসায় ছানা উড়ে যাওয়ার হার ১৯৯৯–২০১৬ সালের গড় ১৭ শতাংশ থেকে ২০১৭–২০১৯ সালে ২৫ শতাংশে উন্নীত হয়। একই সময়ে অনাহারে ছানা মৃত্যুর হার ১৯ শতাংশ থেকে কমে ৪ শতাংশে নেমে আসে।
ছানাদের হাতে তুলে নিয়ে মানুষ দিয়ে বড় করা একটি সম্ভাব্য সমাধান হলেও এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বন্য পরিবেশে বড় হওয়া পাখি সাধারণত খাবার খোঁজা, শিকারি শনাক্ত করা এবং নিজের প্রজাতির অন্য পাখির সঙ্গে সামাজিক বন্ধন তৈরি করার সুযোগ পায়।