'বুনো মানুষ' কি সত্যিই আছে, নাকি লোককথা?

বিগফুট (রহস্যময় বুনো মানুষ)-কে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে মানুষের আগ্রহ যেন নতুন করে বাড়ছে। দেশটির গ্রামীণ জনপদে গাড়ি চালানোর সময় বিগফুটের ছায়ামূর্তি কিংবা ‘গন স্কোয়াচিন’ লেখা স্টিকার দেখা এখন বেশ সাধারণ দৃশ্য। একসময় লোককথার চরিত্র হিসেবে পরিচিত এই কাল্পনিক প্রাণীটি এখন ছড়িয়ে পড়েছে সিনেমা, মঞ্চনাটক, নানা উৎসব এমনকি স্মার্টফোনের ইমোজিতেও।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্ব ওহাইওতে বিগফুট বা এ ধরনের প্রাণী দেখার বেশ কিছু দাবি সামনে আসার পর বিষয়টি জাতীয় সংবাদমাধ্যমেও বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেবল গণমাধ্যমেই নয়, অফ-ব্রডওয়েতেও হাজির হয়েছে এই রহস্যময় প্রাণী। ‘বিগফুট! এ নিউ মিউজিক্যাল’ নামের একটি নতুন কমেডি মিউজিক্যালে এটিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে পুরো গল্প। এর পাশাপাশি চলতি ২০২৬ সালে বিগফুটকে নিয়ে ‘দ্য লাস্ট ফুটপ্রিন্ট’ ও ‘স্ল্যাশ স্কোয়াচ’-এর মতো অর্ধডজনের মতো স্বল্প বাজেটের হরর সিনেমা মুক্তির কথা রয়েছে।

দেশটির বিভিন্ন ছোট শহর ও জনপদেও এখন জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপিত হচ্ছে বিগফুট উৎসব। গত এক দশকে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া বিগফুট ফেস্টিভ্যাল, মিনেসোটার রেমারের বিগফুট ডেজ, নিউইয়র্কের হোয়াইটহল এনওয়াই সাসকুয়াচ ফেস্টিভ্যাল এবং আলাস্কার জেসপার বিগফুট জাম্বোরির মতো আয়োজনগুলোর জনপ্রিয়তা দারুণভাবে বেড়েছে।

চলতি বছর বিগফুটকে নিয়ে ‘ক্যাপচারিং বিগফুট’ নামের একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন মারক ইভান্স। তার মতে, বিগফুটের প্রতি মানুষের এই আকর্ষণের মূল কারণ রহস্য, যা মানুষের মনে সহজাত কৌতূহল জাগায়। তবে তিনি এও উল্লেখ করেন, এমন অনেক মানুষ রয়েছেন যারা এটিকে নিছক রহস্য বলে মনে করেন না। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস, তারা নিজেরাই বিগফুটকে চোখে দেখেছেন এবং সেটাই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় সত্য।

বিজ্ঞানসম্মত কোনো জোরালো প্রমাণ না মিললেও বিগফুটের অস্তিত্ব নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। ছবি, ভিডিও কিংবা কথিত প্রত্যক্ষদর্শীদের নানা বিবরণ অতীতে সামনে এলেও বৈজ্ঞানিক মহলে এর কোনো স্বীকৃতি নেই। মারক ইভান্সের মতে, বর্তমান সময়ে যেখানে ভুল তথ্য ও ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব মুহূর্তেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, ঠিক সেই পরিবেশেই জনপ্রিয়তা পাচ্ছে বিগফুট। এমনকি তার নির্মিত তথ্যচিত্রটিতে দীর্ঘদিন ধরে বিগফুটের অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে চলে আসা একটি উপাদানের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলায়, কেউ কেউ ছবিটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি বলেও দাবি করেছেন।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি অন এনভায়রনমেন্ট, জিওগ্রাফি অ্যান্ড আরবানাইজেশনের সহকারী শিক্ষক জেসিকা ল্যান্ডাও দীর্ঘদিন ধরে বিগফুট নিয়ে গবেষণা করছেন। তার মতে, বিগফুট এখন আর কেবল কোনো অজানা প্রাণীর গল্পে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি মানুষের সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে। ল্যান্ডাও মনে করেন, বিশেষজ্ঞ মহলের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার ঘাটতি রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যের ওপর ভরসা না রেখে অনেকে নিজেই তথ্য খুঁজে নিজের মতো করে বিশ্বাস তৈরি করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের গ্রামীণ শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর একটি অংশের কাছে বিগফুটের রয়েছে অন্যরকম আবেদন। অঞ্চলভেদে এই প্রাণীর আলাদা কিছু নামও প্রচলিত আছে। যেমন ফ্লোরিডায় একে ‘স্কান্ক এপ’, ভার্জিনিয়ায় ‘উডবুগার’ এবং ওহাইওতে ‘ওহাইও গ্রাস ম্যান’ বলা হয়ে থাকে। ল্যান্ডাওয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে নিজেদের পিছিয়ে পড়া বা উপেক্ষিত মনে করা কিছু এলাকার মানুষ বিগফুটকে নিজেদের স্থানীয় গর্বের প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ফলে কোনো এলাকায় বিগফুট দেখার খবর চাউর হলে সেই জায়গার প্রতি বহিরাগতদের আগ্রহও বহুগুণ বেড়ে যায়।

সম্প্রতি উত্তর-পূর্ব ওহাইওতে বিগফুট দেখার যে একাধিক দাবি উঠেছে, সেটিকেও এই সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকেই দেখছেন এই গবেষক। তার পর্যবেক্ষণ বলছে, বিগফুট দেখা গেছে এমন বেশিরভাগ দাবিই আসে বিভিন্ন স্টেট পার্ক থেকে, যেগুলো সাধারণত আয়তনে ছোট এবং সেখানে বিশাল কোনো বনাঞ্চলও থাকে না। যারা বিশেষভাবে বিগফুট খুঁজতে মাঠে নামে, তাদের কাছ থেকেই মূলত এমন দর্শনের দাবি আসার নজির সবচেয়ে বেশি।

ওহাইওতে বসবাসকারী স্বঘোষিত এক বিগফুট অনুসন্ধানকারী গ্লেন অ্যাডকিন্স সম্প্রতি ‘বিগফুট সোসাইটি’ পডকাস্টে কথিত এই দর্শন নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস, মানুষকে বিগফুট দেখার সুযোগ করে দেওয়া হয়।

সব মিলিয়ে বিগফুটের অস্তিত্ব নিয়ে বিতর্ক ও প্রশ্ন যেমন জিইয়ে আছে, তেমনি মার্কিন জনপ্রিয় সংস্কৃতির একটি স্থায়ী অংশে পরিণত হয়েছে এই প্রাণীটি। গাড়ির পেছনের স্টিকার থেকে মঞ্চের মিউজিক্যাল কিংবা স্থানীয় উৎসব থেকে শুরু করে রূপালি পর্দা ও স্মার্টফোনের ইমোজি সবখানেই এর সরব উপস্থিতি। তবে বিগফুট কি আদৌ কোনো রক্তমাংসের অজানা প্রাণী, নাকি কেবল মানুষের কল্পনা, ভুল শনাক্তকরণ আর লোককথার দীর্ঘদিনের এক রহস্য, সেই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো অজানা।

সূত্র: এনপিআর