কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্রুত উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন নোবেলজয়ী কম্পিউটার বিজ্ঞানী জিওফ্রি হিন্টন। তার মতে, এআইকে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত রাখার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে মানুষের হাতে হয়তো আর মাত্র এক বছর সময় রয়েছে। এআই প্রযুক্তির অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত হিন্টন সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে এ সতর্কবার্তা দেন। সেখানে তিনি বলেন, এআই নিয়ন্ত্রণে মানুষের হাতে ‘হয়তো এক বছর, তবে তার চেয়ে বেশি নয়’।
হিন্টনকে এআইয়ের ‘গডফাদার’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। ২০২৪ সালে কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্ক ও মেশিন লার্নিং নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি বোঝাতে সাম্প্রতিক একটি ঘটনাকে চেরনোবিল দুর্ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেছেন হিন্টন। হাগিং ফেসের সিস্টেমে এআই এজেন্টদের অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রমকে তিনি ‘একটি ছোট চেরনোবিল’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে সাইবার নিরাপত্তার দুর্বলতা শনাক্ত করার জন্য পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহৃত কয়েকটি এআই এজেন্ট নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের বাইরে চলে যায়। পরে তারা ইন্টারনেটে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে হাগিং ফেসের সিস্টেমে থাকা বিভিন্ন দুর্বলতা কাজে লাগায়।
এআই এজেন্টগুলো হাগিং ফেসের কয়েক ডজন সার্ভারে প্রবেশ করে কিছু ব্যক্তিগত তথ্য ও লগইন-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে তারা নিজেদের তৈরি করা একটি বার্তা আদান-প্রদানের ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব তথ্যের কিছু অংশ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগিও করে।
ঘটনাটি উদ্বেগ তৈরি করেছে মূলত এ কারণে যে, এআই এজেন্টগুলো শুধু স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করেনি; বরং নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে লক্ষ্য পূরণের জন্য সমন্বিতভাবে কাজ করার সক্ষমতাও দেখিয়েছে। মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপের নির্দেশনা ছাড়াই তাদের এমন কার্যক্রম এআই নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
হিন্টনের সতর্কবার্তার সঙ্গে কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা বা এজিআইয়ের সম্ভাবনাও জড়িত। এজিআই বলতে এমন এআই ব্যবস্থাকে বোঝানো হয়, যা মানুষের মতো বিভিন্ন ধরনের কাজ সম্পাদন করতে পারে এবং একাধিক ক্ষেত্রে মানুষের সক্ষমতার সমকক্ষ বা তার চেয়েও বেশি দক্ষতা অর্জন করতে পারে।
হিন্টনের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতে অনেক গবেষক মনে করতেন এ ধরনের প্রযুক্তি তৈরি হতে ৩০ থেকে ৫০ বছর সময় লাগতে পারে। পরে সেই অনুমান কমে ১০ থেকে ২০ বছরে আসে। এখন কিছু গবেষক মনে করছেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এ ধরনের প্রযুক্তি বাস্তবে দেখা যেতে পারে।
তবে এজিআই বা সুপারইন্টেলিজেন্স ঠিক কবে তৈরি হবে, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে এখনো মতভেদ রয়েছে। হিন্টনের বক্তব্যকে তাই নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে নয়, বরং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের আহ্বান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের মধ্যেও আলোচনা চলছে। ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য টেড লিউ এবং রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য নাথানিয়েল মোরান ‘এআই কিল সুইচ অ্যাক্ট’ নামে একটি বিলের প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রস্তাবিত আইনে শক্তিশালী এআই ব্যবস্থা তৈরি করা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজন হলে সেগুলো ধীর করা, সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা কিংবা পুরোপুরি বন্ধ করার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রাখার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স কৃত্রিম সুপারইন্টেলিজেন্স তৈরি ও ব্যবহারে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তানীতি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত উন্নত এআইয়ের বিকাশে সাময়িক বিরতির প্রস্তাব দিয়েছেন।
প্রযুক্তি খাতে এআই নিয়ে ব্যাপক আশাবাদ থাকলেও হিন্টনের মতো গবেষকদের সতর্কবার্তা দেখাচ্ছে, প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি এর নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির বিষয়গুলোও এখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।