যুক্তরাষ্ট্রে অনলাইনে কেনাকাটা করা পণ্য বাড়িতে পৌঁছে দিতে ডেলিভারি ড্রোনের ব্যবহার বাড়ছে। তবে আকাশে উড়ে চলা এসব ড্রোনের একটানা গুঞ্জন বিরক্তির কারণ হয়ে উঠেছে অনেকের কাছে। এই শব্দ কমাতে নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। তাদের লক্ষ্য, ড্রোনের শব্দ কমিয়ে বাড়ির আশপাশে মানুষের অস্বস্তি দূর করা এবং প্রয়োজনীয় কাজে ড্রোনের ব্যবহার আরও কার্যকর করা।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ডালাস শহরতলির নর্থ গারল্যান্ডের বাসিন্দা অ্যাশলি শ্মিট একসময় নিজের বাগানে সময় কাটাতে এবং স্থানীয় পার্কগুলোতে সাইকেল চালিয়ে যেতে পছন্দ করতেন। সেখানে পোকামাকড়, টিকটিকি ও ব্যাঙের কাছ থেকে ছবি তুলতেন তিনি। কিন্তু প্রতিবেশীদের অনলাইনে কেনা পণ্য পৌঁছে দিতে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া ড্রোনের শব্দে এখন এসব কাজ থেকে দূরে সরে গেছেন ৪৪ বছর বয়সী এই প্রশাসনিক সহকারী।
শ্মিটের ভাষায়, ড্রোনের শব্দ অত্যন্ত বিরক্তিকর। এটি তাঁর মধ্যে বিপদ মোকাবিলা বা সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার মতো স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। ড্রোন কাছে আসার সময়, বাড়ির ঠিক ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় এবং দূরে সরে যাওয়ার সময়ও এর শব্দ শোনা যায়। এমনকি ঘরের ভেতরেও শব্দটি তাঁর কানে পৌঁছায়।
অ্যামাজন ও ওয়ালমার্টের মতো প্রতিষ্ঠান দ্রুত পণ্য পৌঁছে দিতে ডেলিভারি ড্রোনের ব্যবহার বাড়াচ্ছে। একসময় নতুন প্রযুক্তির আকর্ষণ হিসেবে দেখা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক এলাকায় এখন এসব ড্রোন দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছে।
অ্যামাজনের প্রাইম এয়ার প্রায় ৫০০টি শহর ও ছোট শহরে ডেলিভারি সেবা সম্প্রসারণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এ সেবায় জুতার বাক্সের সমান জায়গায় রাখা যায়, এমন পণ্য পৌঁছে দেওয়া হয়। যুক্তরাজ্যের উত্তরাঞ্চলের ডার্লিংটন ও আশপাশের এলাকাতেও এ সেবা চালু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কিছু শহরে স্থানীয় পিৎজা ও আইসক্রিমের দোকান থেকেও ড্রোনের মাধ্যমে খাবার অর্ডার করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কেন ড্রোনের শব্দ বেশি বিরক্তিকর
শহরে যানবাহনের শব্দ নিয়মিত শোনা গেলেও ড্রোনের শব্দ অনেকের কাছে আলাদাভাবে বিরক্তিকর মনে হয়। গাড়ির চলাচলের শব্দ একসময় আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিশে যায়। কিন্তু ড্রোনের পাখার তীক্ষ্ণ গুঞ্জন হঠাৎ করে অন্য শব্দের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব স্যালফোর্ডের অ্যাকুস্টিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও সাইকোঅ্যাকুস্টিকসের অধ্যাপক আন্তোনিও তোরিহা মার্তিনেজ বলেন, আশপাশের সামগ্রিক শব্দের মাত্রা তুলনামূলক কম হলেও ড্রোনের শব্দ বিশেষভাবে নজরে পড়ে।
বিমানের তুলনায় ড্রোন নিচু উচ্চতায় ওড়ে এবং আবাসিক এলাকার ওপর দিয়েও চলাচল করতে পারে। ফলে যেসব এলাকায় আগে উড়োজাহাজের শব্দ তেমন শোনা যেত না, সেখানকার মানুষও নতুন করে এ শব্দের মুখোমুখি হচ্ছেন। এতে স্থানীয় পরিবেশের শব্দের পরিবর্তনের প্রতি তাঁদের সংবেদনশীলতা বাড়তে পারে।
মার্তিনেজের মতে, কোনো শব্দের উৎস নতুন, অনুপ্রবেশকারী বা ঘন ঘন ঘটছে বলে মনে হলে মানুষ সেটির প্রতি বেশি বিরক্তি অনুভব করতে পারেন। ড্রোনের মাধ্যমে পণ্য পাওয়ার সুবিধা যাঁরা ভোগ করেন, তাঁরা হয়তো এর শব্দ অন্যদের তুলনায় কম বিরক্তিকর মনে করবেন।
তবে ড্রোনের ব্যবহার যত বাড়বে, শব্দ নিয়ে অভিযোগও তত বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি। বর্তমানে কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় এ সমস্যা দেখা গেলেও ড্রোন খাতের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি মানুষ এ ধরনের অভিযোগ তুলতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্যিক ড্রোন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ)। তবে ডেলিভারি ড্রোনের শব্দ নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগে সংস্থাটি সমালোচনার মুখে পড়েছে। এফএএর বক্তব্য, এ ধরনের সমস্যা সমাধানে ড্রোন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের নেতাদেরই প্রধান দায়িত্ব পালন করতে হবে।
শব্দ কমাতে নতুন প্রযুক্তি
ড্রোনের বিরক্তিকর শব্দ কমাতে কাজ করছে লন্ডনভিত্তিক স্টার্টআপ গ্রিনজেটস। প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিবিষয়ক প্রধান ড্যারেন জেমসের ভাষায়, শুধু শব্দের মাত্রা নয়, শব্দের কম্পাঙ্কের দিকেও নজর দিচ্ছে তারা। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের তৈরি প্রপালশন বা চালনব্যবস্থা ড্রোনের শব্দ অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ কমাতে পারে।
সাধারণ ড্রোনে খোলা বাতাসে ঘুরতে থাকা প্রপেলার বা পাখা বাতাস কেটে তীক্ষ্ণ গুঞ্জন তৈরি করে। গ্রিনজেটসের প্রযুক্তিতে ঘূর্ণায়মান ব্লেড একটি আবরণের ভেতরে রাখা হয়। এতে শব্দ কিছুটা আটকে যায় এবং শব্দের প্রবাহ মাটি থেকে অন্যদিকে পরিচালিত করা সম্ভব হয়। পাশাপাশি রোটরের ঘূর্ণনের গতি কমানো এবং কম্পনজনিত শব্দ হ্রাসকারী উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমেও শব্দ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
শুধু আবাসিক এলাকার মানুষের বিরক্তি দূর করাই এ প্রযুক্তির উদ্দেশ্য নয়। জার্মানিতে পুলিশ ও বন্দর নিরাপত্তা দল গ্রিনজেটসের কম শব্দের প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। আফ্রিকায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মীরাও ওপর থেকে চোরাশিকারিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে এ ধরনের প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েছেন, যাতে ড্রোনের শব্দে তাদের উপস্থিতি সহজে টের পাওয়া না যায়।
যুদ্ধক্ষেত্রেও ড্রোনের শব্দ কমানোর গুরুত্ব রয়েছে। শব্দ বেশি হলে প্রতিপক্ষ আগেই ড্রোনের উপস্থিতি বুঝতে পারে। যুক্তরাজ্যের গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (রুসি) গবেষক রবার্ট টোলাস্ট জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী পরীক্ষামূলক পর্যায়ে ড্রোনের শব্দ কমানোর বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে।
তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত বড় ড্রোনের ক্ষেত্রে শব্দ কমানোর চেয়ে গতি বাড়ানোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করেন টোলাস্ট। তাঁর মতে, এসব ড্রোনের নকশায় নীরবতার চেয়ে দ্রুতগতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে।
প্রপেলারের নকশায় পরিবর্তন
যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েটভিত্তিক উদ্যোক্তা গ্রেগ শ্যারোর ড্রোনের শব্দ কমানোর ভাবনা শুরু হয় ২০১২ সালে। একটি ধ্রুপদি সংগীত পরিবেশনা ধারণ করার সময় তাঁকে বিশেষ কোণ থেকে একজন বেহালাবাদকের ভিডিও করতে হয়েছিল। এ কাজে ড্রোন প্রয়োজন হলেও এর শব্দের কারণে সেটি ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
শ্যারো বুঝতে পারেন, ড্রোনের বেশির ভাগ শব্দ মোটর থেকে নয়, বরং প্রপেলার থেকে তৈরি হয়। বিশেষ করে প্রপেলারের ব্লেডের প্রান্ত বাতাস কাটার সময় শব্দ সৃষ্টি করে। এরপর তিনি প্রান্তবিহীন প্রপেলার কেমন হতে পারে, তা নিয়ে চিন্তা শুরু করেন।
এর ফল হিসেবে তিনি বাঁকানো ও লুপের মতো আকৃতির ব্লেডযুক্ত একটি প্রপেলার তৈরি করেন, যার কোনো ধারালো প্রান্ত নেই। বারবার ড্রোন উড়িয়ে পরীক্ষা করার চেয়ে পানিতে প্রপেলারের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা সহজ হওয়ায় প্রথমে তিনি কম শব্দের নৌকার প্রপেলার তৈরি করেন। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠান শ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রোনের জন্য অত্যন্ত কম শব্দের রোটর তৈরিতে মনোযোগ দিচ্ছে।
শ্যারোর দাবি, ড্রোনে এ প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাই করা হয়েছে এবং এতে শব্দ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
শব্দ কমানোর চেষ্টা করছে ডেলিভারি প্রতিষ্ঠানও
ড্রোনের শব্দ কমাতে ডেলিভারি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও কাজ করছে। অ্যামাজনের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তাদের ড্রোনের শব্দে পরিমাপযোগ্য উন্নতি হয়েছে। সর্বশেষ নকশায় বিশেষভাবে তৈরি প্রপেলার ব্যবহার করা হচ্ছে, যা আগের প্রজন্মের ড্রোনের তুলনায় মানুষের কানে অনুভূত শব্দ প্রায় অর্ধেক কমাতে পারে। পাশাপাশি শব্দের তীক্ষ্ণতাও কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
ওয়ালমার্টের পণ্য সরবরাহে ড্রোন ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠান উইং। তাদের দাবি, প্রপেলার এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যাতে শব্দের মাত্রা কম থাকে। একই বাড়ি বা এলাকার ওপর দিয়ে বারবার ড্রোন চলাচল এড়াতে ফ্লাইটের পথও পরিবর্তন করা হয়।
তবে এসব উদ্যোগে সন্তুষ্ট নন অ্যাশলি শ্মিট। তাঁর মতে, ড্রোনের শব্দে প্রতিবেশীদের ভোগান্তি বন্ধ করার কার্যকর সমাধান না পাওয়া পর্যন্ত তাঁর এলাকায় ডেলিভারি ড্রোন চলাচল বন্ধ রাখা উচিত। তিনি বলেন, ড্রোন সেবা কীভাবে মানুষের জন্য বিরক্তির কারণ না হয়ে উঠতে পারে, তা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত এ সেবা পুরোপুরি বন্ধ থাকাই তাঁর প্রত্যাশা।
সূত্র: বিবিসি