ডিমেনশিয়া গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে এআই

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৫ পিএম

বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ মানুষ ডিমেনশিয়ায় (স্মৃতিভ্রংশ) আক্রান্ত হয়ে জীবনযাপন করছেন। এ রোগের চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায় খুঁজতে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চালালেও বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ, গবেষণার ফল একত্র করা এবং দক্ষ বিশেষজ্ঞের সীমাবদ্ধতার কারণে নতুন আবিষ্কারের গতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর। এই পরিস্থিতি বদলাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে বায়োমেডিক্যাল গবেষণা ও নিউরোডিজেনারেশনবিষয়ক কনসোর্টিয়াম সি-ব্রেইন (C-BRAIN)। এ কাজে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়া।

আলঝেইমার রোগ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ। প্রতিবছর বিশ্বে ১ কোটিরও বেশি নতুন ডিমেনশিয়া রোগী শনাক্ত হন। গত ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের (এনআইএইচ) অর্থায়ন সাত গুণ বেড়ে বছরে ৩৯০ কোটি ডলারে পৌঁছালেও আলঝেইমার রোগ পুরোপুরি বন্ধ করা, প্রতিরোধ করা বা এর প্রভাব উল্টে দেওয়ার মতো চিকিৎসা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি।

গবেষকদের মতে, এ ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা হলো উচ্চ প্রভাবসম্পন্ন গবেষণার সীমাবদ্ধতা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে থাকা তথ্য এক জায়গায় ব্যবহার করতে না পারা এবং প্রকাশিত গবেষণার ফল দ্রুত বিশ্লেষণ করে নতুন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জটিলতা।

গবেষণায় এআই ব্যবহারে নতুন উদ্যোগ

সি-ব্রেইন ২০২৫ সালের নভেম্বরে যাত্রা শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানী র‍্যান্ডাল বেটম্যান। একাডেমিক প্রতিষ্ঠান, দাতব্য সংস্থা, ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ও গবেষণা সংস্থাসহ মোট ১৮টি সদস্যপ্রতিষ্ঠান নিয়ে গঠিত এই কনসোর্টিয়ামের লক্ষ্য, গবেষণার প্রক্রিয়া দ্রুত করে নতুন চিকিৎসা উদ্ভাবনের পথ তৈরি করা।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের নিউরোলজির অধ্যাপক এবং সি-ব্রেইনের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক বেটম্যান বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে গবেষণা করার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে আবিষ্কারের গতি বাড়িয়ে রোগীদের জন্য নতুন চিকিৎসা উদ্ভাবনে সহায়তা করা সম্ভব হতে পারে।

তাঁর ভাষায়, বিজ্ঞানীদের জন্য বিজ্ঞানীদের তৈরি এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করেই গবেষণার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে সি-ব্রেইন।

প্রতিষ্ঠানটি এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলছে, যার মাধ্যমে আলঝেইমার-সংক্রান্ত আগে ব্যবহার না করা গবেষণার তথ্য কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীদের আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে কাজ করতে সহায়তা করা হবে।

গবেষণার অপ্রকাশিত তথ্যও কাজে লাগবে

আলঝেইমার গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায় না। এর মধ্যে রয়েছে অপ্রকাশিত গবেষণার ফল, যেসব পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রিত বা মালিকানাধীন তথ্য। সি-ব্রেইন এ ধরনের তথ্যকে ‘ডার্ক ডেটা’ বা অপ্রকাশিত ও অপ্রচলিত গবেষণাতথ্য হিসেবে উল্লেখ করছে।

সি-ব্রেইনের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা আদে ওজেওলে বলেন, জীবনবিজ্ঞানের অনেক তথ্য উন্নত এআই মডেলগুলোতে পৌঁছায় না। ফলে এসব তথ্য থেকে নতুন জ্ঞান অর্জনের সুযোগও কাজে লাগানো সম্ভব হয় না।

এই তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে রোগীর গোপনীয়তা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিয়মকানুন বজায় রাখা জরুরি। এ জন্য সি-ব্রেইন কেন্দ্রীয় ও ফেডারেটেড—দুই ধরনের তথ্য ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে একটি পদ্ধতি ব্যবহার করছে। এতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য সেখানেই সংরক্ষিত থাকে, কিন্তু এআই মডেলগুলো সেই তথ্য থেকে শিখতে পারে। ফলে গবেষণার জন্য সব তথ্য এক জায়গায় স্থানান্তর করার প্রয়োজন হয় না।

এ ধরনের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরি ও বড় পরিসরে পরিচালনা করা বেশ জটিল। এ ক্ষেত্রে এনভিডিয়ার প্রযুক্তি ও কম্পিউটিং সক্ষমতা সহযোগিতা করছে।

বর্তমানে সি-ব্রেইনের নিজস্ব স্থাপনায় এনভিডিয়ার ৬৪টি ডেটা সেন্টার জিপিইউ ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি মাইক্রোসফট অ্যাজুর ক্লাউডের নোডও কাজে লাগানো হচ্ছে। ভবিষ্যতে এনভিডিয়ার ব্ল্যাকওয়েল সিস্টেমসহ আরও জিপিইউ যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

গবেষণার প্রযুক্তিগত চাহিদা মেটাতে এনভিডিয়ার বায়োনিমো (BioNeMo) ওপেন ডেভেলপার প্ল্যাটফর্ম এবং মনাই (MONAI) ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহারের বিষয়েও কাজ করছে সি-ব্রেইন।

কয়েক সপ্তাহের কাজ হচ্ছে কয়েক মিনিটে

সি-ব্রেইনের গবেষকেরা ইতিমধ্যে দুটি এআইভিত্তিক টুল তৈরি করেছেন—ওপেনসায়েন্টিস্ট (OpenScientist) ও ইনসাইটইঞ্জিন (InsightEngine)। প্রথমটি লরেন্স বার্কলে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির সহযোগিতায় তৈরি হয়েছে। এ কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন গবেষক জাস্টিন রিজ। অন্যদিকে, ইনসাইটইঞ্জিন তৈরি করা হয়েছে ৩৮৭ ল্যাবসের সঙ্গে।

ওপেনসায়েন্টিস্ট একটি উন্মুক্ত উৎসের এআই গবেষণা সহকারী। এটি গবেষকের প্রশ্ন ও তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বা অনুমান তৈরি করতে পারে, বিশ্লেষণ চালাতে পারে এবং যাচাইযোগ্য ফলাফল উপস্থাপন করতে পারে। এর অনেক কাজ মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই সম্পন্ন হয়, যদিও পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় নয়।

অন্যদিকে, ইনসাইটইঞ্জিন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিভিন্ন অনুমান যাচাই করতে এআই ব্যবহার করে। এটি গবেষকের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে, জীববিজ্ঞানের জ্ঞানভান্ডারের সঙ্গে তথ্যের সম্পর্ক খোঁজে এবং প্রতিটি দাবির পক্ষে প্রমাণ যাচাই করার চেষ্টা করে। এর উদ্দেশ্য হলো এআইয়ের ভুল বা ভিত্তিহীন তথ্যের ঝুঁকি কমানো, যাতে গবেষকেরা ব্যয়বহুল পরীক্ষা শুরু করার আগেই সম্ভাব্য ভুল শনাক্ত করতে পারেন।

প্রকাশিত কয়েকটি কেস স্টাডি অনুযায়ী, ওপেনসায়েন্টিস্ট এমন কিছু বিশ্লেষণ কয়েক মিনিটে সম্পন্ন করেছে, যা করতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের গবেষকদের কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে বলে ধারণা ছিল। প্রতিবার এ টুল চালানোর খরচও ছিল ১০ ডলারের কম।

সি-ব্রেইনের বর্তমান কার্যক্রমের আওতায় ২০০টির বেশি গবেষক দল রয়েছে। এ প্রযুক্তি বড় পরিসরে ব্যবহৃত হলে বছরে ১০ লাখ ঘণ্টারও বেশি গবেষণাসময় সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে এটি সম্ভাব্য হিসাব; বাস্তবে কতটা সময় সাশ্রয় হবে, তা ব্যবহারের পরিসর ও গবেষণার ধরন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।

রোগের কারণ শনাক্তে বহুমাত্রিক এআই মডেল তৈরির লক্ষ্য

ভবিষ্যতে সি-ব্রেইন বিভিন্ন ধরনের জৈবিক ও চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করে একটি বহুমাত্রিক বায়োলজিক্যাল ফাউন্ডেশন মডেল তৈরির পরিকল্পনা করছে। এতে মস্তিষ্কের চিত্র, বিভিন্ন জৈব অণুর তথ্য, রক্ত ও অন্যান্য শারীরিক তরলে পাওয়া রোগের সূচক এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্লিনিক্যাল তথ্য একত্রে ব্যবহার করা হবে।

প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, কার্যক্রমের তৃতীয় বছরের মধ্যে মস্তিষ্কের বার্ধক্য ও আলঝেইমার রোগের নতুন কার্যকারণ প্রক্রিয়া শনাক্ত করা। অর্থাৎ, রোগের সঙ্গে কোন বিষয়গুলোর শুধু সম্পর্ক রয়েছে তা খুঁজে বের করার পাশাপাশি কোন প্রক্রিয়া রোগ সৃষ্টিতে সরাসরি ভূমিকা রাখে, সে বিষয়ে পরীক্ষাযোগ্য বৈজ্ঞানিক ধারণা তৈরি করতে চায় তারা।

বেটম্যানের মতে, চিন্তা ও যুক্তি প্রয়োগে সক্ষম এআই এমন আবিষ্কারের গতি বাড়াতে পারে, যা ভবিষ্যতে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর প্রতিরোধ ও চিকিৎসাপদ্ধতি তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।

তবে এআইয়ের মাধ্যমে গবেষণার গতি বাড়লেও আলঝেইমার বা ডিমেনশিয়ার চিকিৎসা আবিষ্কৃত হয়ে গেছে—এমন নয়। সি-ব্রেইনের উদ্যোগটি মূলত গবেষণার তথ্য ব্যবহার, বিশ্লেষণ ও নতুন সম্ভাবনা শনাক্ত করার প্রক্রিয়াকে দ্রুত করার প্রচেষ্টা।

সূত্র: এনভিডিয়া ব্লগ

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত