রাজস্ব ব্যবস্থাপনার সংস্কার, রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ট্রেড ফেসিলিটেশন, ডিজিটালাইজেশন এবং করের আওতা সম্প্রসারণসহ বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে। এমন উদ্যোগকে স্বল্প মেয়াদে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
এনবিআরের দাবি, এমন পদক্ষেপে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার কার্যকর মনিটরিং, রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতা নিশ্চিতকরণে নানামুখী কার্যকর ব্যবস্থার মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধ এবং ফাঁকি দেওয়া কর পুনরুদ্ধারসহ ইতিবাচক ফল আসা শুরু করেছে।
যার মধ্যে রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পৃথক করার লক্ষ্যে ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি ও বাস্তবায়নের উদ্যোগকে বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সার্বিকভাবে, নীতি সংস্কার, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এনবিআর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংক্ষিপ্ত মেয়াদকালে রাজস্ব ব্যবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।
এনবিআরের একগুচ্ছ সফলতা
রাজস্ব আদায়ে গতিশীলতার অংশ হিসেবে গত ছয় মাসে (জুন-ডিসেম্বর) এনবিআরের রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ লাখ ৮৫ লাখ হাজার কোটি টাকার বেশি। রাজস্ব আহরণে কাঠামোগত সংস্কার ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার ফলে চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ১৪ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। জুলাই থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সময়ে এনবিআর মোট ১ লাখ ৮৫ হাজার ২২৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৩ হাজার ২০ কোটি টাকা বেশি।
অন্যদিকে ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে স্ট্রেন্থেনিং ডিজিটাল রেভিনিউ ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট (এসডিআরএমপি) বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর আওতায় চালু হয়েছে অনলাইন আয়কর রিটার্ন দাখিল, অনলাইন ভ্যাট রিফান্ড, ই-চালান, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে কর পরিশোধ ব্যবস্থা।
আয়কর খাতে অধিকাংশ করদাতার জন্য ই-রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ইতোমধ্যে ৩৪ লাখের বেশি রিটার্ন অনলাইনে জমা পড়েছে, যা করজালের সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আয়কর আইন যথাযথভাবে পরিপালন করে আয়কর রিটার্ন দাখিল এবং আয়কর পরিশোধে করদাতাগণকে পেশাদারি সেবা প্রদানের সুবিধার্থে এবং কর সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে ১৩ হাজার ৫০০ জনকে আয়কর প্র্যাকটিশনার বা আইটিপি সনদ প্রদান করা হয়েছে।
ট্রেড ফ্যাসিলিটেশনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতি মাসে এনবিআর অংশীজনের সঙ্গে মতবিনিময় সভার আয়োজন করছে। এ অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা উপস্থিত হয়ে কাস্টমস, আয়কর এবং ভ্যাট বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে তাদের সমস্যার কথা সরাসরি এনবিআর চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিকট উপস্থাপন করতে পারছেন। এতে মাঠ পর্যায়ের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভের পাশাপাশি সমস্যা সমাধানের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগকে ইতিবাচর হিসেবেই দেখছে সংশ্লিষ্টরা।
চলতি বছরে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি করদাতাগণের জন্য মোবাইল ফোনের পরিবর্তে তাদের নিজস্ব ই-মেইলে ওটিপি প্রেরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এর ফলে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি করদাতারা ই-রিটার্ন সিস্টেমে রেজিস্ট্রেশন করে সহজেই অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে পারছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। এ পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত ৫ হাজারের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি করদাতা অনলাইনে ই-রিটার্ন দাখিল করেছেন।
ই-রিটার্ন এবং অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে আমদানিকারক আমদানি পর্যায়ে পরিশোধিত অগ্রিম আয়করের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে ই-রিটার্নে ক্রেডিট দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। শিগগিরই ভ্যাটের অনুরুপ অনলাইনে সরাসরি করদাতার নিজস্ব ব্যাংক হিসেবে আয়কর ফেরত প্রদান ব্যবস্থা চালু হবে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে ভ্যাট খাতে করদাতা সম্প্রসারণে বিশেষ অভিযান চালানো হয়। যেখানে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ১ লাখ ৩১ হাজার নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় আসে। বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ লাখ ৭৫ হাজারে।
কাস্টমস ব্যবস্থাপনায় পণ্য খালাস দ্রুত করতে চালু হয়েছে বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো (BSW), ট্রাক মুভমেন্ট সাব-মডিউল, এবং শিপিং ও সিএন্ডএফ এজেন্টদের জন্য নতুন লাইসেন্সিং বিধিমালা। এতে বন্দরে পণ্য খালাসের সময় ও ব্যয় কমছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার জট কমানোর লক্ষ্যে বন্দরে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা প্রায় ৬ হাজার ৬৯ কন্টেইনার ইনভেন্টরি সম্পন্ন করে তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিলামে বিক্রয় করার জন্য বিশেষ আদেশ জারি করেছে। ইতোমধ্যে ২ হাজারের বেশী কন্টেনার অকশন সম্পন্ন করে প্রায় ৮ শত কন্টেনার চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নিলামকারীকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস দ্রুততার সাথে চলমান নিলাম সম্পন্ন করে চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার জট কমাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।
জনস্বার্থ বিবেচনায় সরকার হজ টিকিটে আবগারি শুল্ক প্রত্যাহার, মেট্রোরেলে ভ্যাট ছাড়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে শুল্ক-কর হ্রাস, এবং মোবাইল ফোন আমদানিতে শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসাবে দেখছে এনবিআর।