বাজারে ভোজ্যতেলের তীব্র সংকট

ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বাসের বাণী শোনানো হলেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন নেই। উল্টো রাজধানীর বাজারগুলোতে সয়াবিন তেলের চরম অভাব দেখা দেওয়ায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত কয়েক দিন ধরে খুচরা দোকানগুলোতে বোতলজাত সয়াবিন তেল অনেকটা উধাও। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডিলারদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় তারা চাহিদা মেটাতে পারছেন না।

অন্যদিকে যেসব দোকানে তেল মিলছে, তারা অন্য পণ্যের সঙ্গে শর্ত মেনে কোম্পানি থেকে তেল পেয়েছেন বলে জানান। এ কারণে এখন খুচরা বিক্রেতারাও সয়াবিন তেলের বোতলের সঙ্গে ক্রেতাদের অন্য পণ্য কেনার শর্ত দিচ্ছেন। বিক্রেতারা বলছেন, কোম্পানির পরিবেশকেরাই তাদের এসব পণ্য কিনতে বাধ্য করছেন। তাই ক্রেতাদেরও তেলের সঙ্গে ওইসব পণ্য কেনার শর্ত আরোপ করতে হচ্ছে তাদের।

অনেক দোকানে বেশি পণ্য নেওয়ার পরে সয়াবিন তেল বিক্রি করতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে সয়াবিন তেল। বোতলজাত তেলের সরবরাহ সংকটে খোলা তেলও বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে বোতলজাত তেলের বোতলে উল্লেখিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) ১৯৫ টাকা প্রতি লিটার। অথচ খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ২০০ থেকে ২২০ টাকা ও পাম তেল ১৯০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া যেসব দোকানে বোতলের সয়াবিন তেল রয়েছে, তারাও বোতলের গায়ে লেখা সর্বোচ্চ মূল্য থেকে বেশি দামে বিক্রি করছে।

হাতিরপুল এলাকার মাশাআল্লাহ ডিপার্টমেন্ট স্টোরের খুচরা বিক্রেতা পাভেল হাসান বলেন, ৮-১০ দিন ধরে আমার দোকানে তেল নেই। তেল কিনতে গেলে বা অর্ডার দিতে গেলেই কোম্পানি শর্ত জুড়ে দেয়। তাদের অন্য পণ্য আটা ও চালসহ সঙ্গে কিছু কিনলে তবেই তেল দিতে চায়, তাও আবার সব টাকা নগদ দিতে হবে। তাই সম্ভব না হওয়ায় দোকানেই তেল রাখতে পারছি না। এ ছাড়া অনেক কোম্পানি তেলের অর্ডারও নেয় না। জিগ্যেস করলে মুখের ওপর বলে দেয় তেল নেই। দিনশেষে কাস্টমাররা এসে দোকান থেকে তেল ছাড়াই ঘুরে যায়।

মিরপুর ৬ নম্বর কাঁচাবাজারের জনতা স্টোরের দোকানি জানান, ওপর মহল তেল সব ধরে রেখেছে। ইতিমধ্যে প্রতি লিটার তেলে ১৩ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে। শুধু গ্রিন সিগনাল পেলেই তারা সে মজুদ করা তেল বাজারে ছাড়বেন। এ জন্যই এখন বাজারে এই সংকট তৈরি হয়ে আছে। আমরা আর কি করব? তেল না পেলে বিক্রিও করব না। আমরা আর কয় টাকা লাভ করি বোতলে!

এদিকে বাজারে তেলের এমন হাহাকারে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আওয়াল হোসেন নামে এক ক্রেতা জানান, একদিকে মন্ত্রী বলেছে তেলের দাম বাড়বে না এবং বাজারে তেল পাওয়া যাবে, কিন্তু বাস্তবে তেল না পাওয়ার এই চিত্র কি সরকার দেখে না? এই বিষয়ে কি তাদের বাস্তব জ্ঞান নেই? তেলের এই সিন্ডিকেট কি সরকারের চেয়েও বেশি শক্তিশালী কি না আমার বুঝে আসে না। বাজারে এক দোকানে তেল পেলে আবার অন্য দুই দোকানে তেল পাই না। এমন চিত্রের পরিবর্তন চায় সবাই।

আরেক ক্রেতা মারুফ হাসান অভিযোগ করেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা যোগসাজশ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। সরকারের উচিত কেবল বৈঠক না করে বাজার তদারকিতে কঠোর হওয়া।

গত ১২ এপ্রিল ভোজ্য তেল সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। ওই বৈঠকে তিনি জানান, জনগণের কথা ভেবে আপাতত ভোজ্য তেলের দাম বাড়ছে না। ভোজ্য তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং বাজারে কোনো ধরনের সংকট বা অস্থিরতা যাতে সৃষ্টি না হয় সে জন্য সরকার দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। 

এ ছাড়া তিনি জানান, সরকার ব্যবসায়ীদের টিকে থাকার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ধরনের পণ্য আমদানির জন্য বড় আর্থিক সক্ষমতা প্রয়োজন। কোনো ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বাজার থেকে সরে গেলে, সেটি দেশের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দাম না বাড়িয়ে ব্যবসায়ীদের শুল্কছাড় দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। 

এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে আলোচনা করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তবে সেই আলোচনা আর বক্তব্যের কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি বাজারে। আগের মতোই তেল খুঁজতে ছুটাছুটি করতে হচ্ছে তার পরদিন থেকেই। ফলে সরকারের প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন নাগরিকরা।