শেয়ারবাজারে আসছে ‘স্পেসএক্স’, আর কত ধনী হবেন মাস্ক

বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক–এর মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে যাচ্ছে। বুধবার (২০ মে) প্রতিষ্ঠানটি মার্কিনমার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কাছে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও–সংক্রান্ত প্রসপেক্টাস জমা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি হতে যাচ্ছে ওয়াল স্ট্রিট ইতিহাসের অন্যতম বড় এবং বহুল আলোচিত আইপিও।

সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী জুন মাসেই প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ারবাজার ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ সিকিউরিটিজ ডিলারস অটোমেটেড কোটেশনস (নাসডাক)–এ ‘SPCX’ টিকারে স্পেসএক্সের শেয়ার লেনদেন শুরু হতে পারে। এই আইপিওর মাধ্যমে কোম্পানিটি বাজার থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৮০ বিলিয়ন ডলার মূলধন সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

আইপিও নথিতে স্পেসএক্সের সম্ভাব্য বাজারমূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৭৫ ট্রিলিয়ন ডলার। কোম্পানিটিতে ইলন মাস্কের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা থাকায় এই আইপিও–পরবর্তী সময়ে তার ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেই হিসেবে ইতিহাসের প্রথম ‘ট্রিলিয়নিয়ার’ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। বর্তমানে টেসলা ও স্পেসএক্সের মালিক মাস্কের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইপিও ফাইলিংয়ের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো স্পেসএক্সের অভ্যন্তরীণ আর্থিক চিত্রও প্রকাশ্যে এসেছে। নথি অনুযায়ী, কোম্পানিটির আয় ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও এখনো তারা বড় অঙ্কের লোকসানে রয়েছে। গত বছরে স্পেসএক্সের মোট আয় ছিল ১৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, বিপরীতে নেট লোকসান হয়েছে ৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। আর চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার বিক্রির বিপরীতে নেট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে।

কোম্পানিটির ব্যালেন্স শিটে আরও দেখা গেছে, রকেট, মহাকাশ সরঞ্জাম ও অন্যান্য সম্পদ মিলিয়ে মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১০২ বিলিয়ন ডলার। তবে এর বিপরীতে ঋণের পরিমাণও কম নয়; বর্তমানে স্পেসএক্সের মোট দায় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে।

বিশ্লেষকদের মতে, স্টারলিংক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, স্টারশিপ মেগা রকেট উন্নয়ন এবং মঙ্গলে মানব বসতি স্থাপনের মতো উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগের কারণেই কোম্পানিটি সাময়িকভাবে লোকসানে রয়েছে।

আইপিও নথিতে উঠে এসেছে আরও একটি আলোচিত তথ্য। মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান xAI, যা সম্প্রতি স্পেসএক্সের সঙ্গে একীভূত হয়েছে, তাদের ‘কোলোসাস ১’ ডেটা সেন্টারের কম্পিউটিং শক্তি ব্যবহারের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক–এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করেছে। ২০২৯ সালের মে পর্যন্ত কার্যকর থাকা এই চুক্তি অনুযায়ী, অ্যানথ্রোপিক প্রতি মাসে প্রায় ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করবে, যা স্পেসএক্সের রাজস্ব বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে আইনি জটিলতা মোকাবিলার জন্য আইপিও নথিতে ৫০ কোটি ডলারেরও বেশি সংরক্ষিত রাখার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মাস্কের তৈরি চ্যাটবট ‘গ্রোক’–কে ঘিরে বিভিন্ন বিতর্ক ও মামলার বিষয়। এই বিতর্কের জেরেই স্বাধীনভাবে পরিচালিত xAI–এর কার্যক্রম স্পেসএক্সের অধীনে নিয়ে আসা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স–ও এখন স্পেসএক্সের মালিকানার অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

আইপিও আবেদনটি এমন এক সময় এলো, যখন মাত্র কয়েক দিন আগে প্রতিদ্বন্দ্বী এআই প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই এবং এর প্রধান স্যাম অল্টম্যান–এর বিরুদ্ধে দায়ের করা বহুল আলোচিত মামলায় পরাজিত হয়েছেন ইলন মাস্ক। আদালত সর্বসম্মতিক্রমে সেই মামলা খারিজ করে দেয়।

রকেট উৎক্ষেপণ ও স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবায় স্পেসএক্স বর্তমানে বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান ধরে রাখলেও, মাস্কের রাজনৈতিক অবস্থান, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা এবং কোম্পানির শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক ভবিষ্যতে বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলবে, এখন সেদিকেই নজর বিশ্লেষকদের।