বাজেট ২০২৬-২৭: অগ্রাধিকার পাচ্ছে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান

দেশের ভঙ্গুর দশা থেকে উত্তরণ এবং স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতির চাকা সচল করতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা ফিরিয়ে আনতে চায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। বর্তমান বাস্তবতায় সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সীমিত সম্পদের মধ্যে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা। এমন লক্ষ্য নিয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে একটি বিশেষ কৌশলগত রূপরেখা ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। 

এবারের বাজেটে শুধু ঘাটতি পূরণের প্রথাগত হিসাব-নিকাশ নয়, বরং সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে পড়া বিনিয়োগে গতি ফেরানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর। খাদের কিনারে পৌঁছানো অর্থনীতিকে টেনে তুলতে এই বাজেটকে একটি বড় চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, গত দেড় দশকেরও বেশি সময়ে বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের সীমিত সম্প্রসারণ, ব্যাপক অর্থ পাচার, ডলারের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধীরগতি এবং ব্যাংকিং খাতের চরম দুর্বলতার ফলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। এই ক্রান্তিকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার মনে করছে, অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি।

এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, একটি বড় আকারের বা উচ্চাভিলাষী বাজেট ঘোষণা করা হয়তো সহজ, কিন্তু বর্তমানের ভঙ্গুর ও ক্ষতবিক্ষত অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতা ও টেকসই সমৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। এই কঠিন বাস্তবতাকে সামনে রেখেই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের মূল দর্শন হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ’ বা ডেমোক্রেটাইজেশন অব ইকোনমি। এই দর্শনের মূল অঙ্গীকারই হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মকাণ্ডের সুফল যেন কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে।

সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং তা যেন সমাজের সর্বস্তরের ও সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছায়। বিশেষ করে, তীব্র মূল্যস্ফীতির এই সময়ে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীকে সরাসরি আর্থিক ও সামাজিক সহায়তা দেওয়াকে এই বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য করা হয়েছে, যা অত্যন্ত সময়োপযোগী।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের এই নাজুক অর্থনীতিকে টেনে তুলতে কেবল গতানুগতিক বরাদ্দ দেওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং প্রকৃত পুনরুদ্ধারের জন্য দরিদ্র মানুষের সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং সৃজনশীল অর্থনীতির মতো সম্ভাবনাপূর্ণ খাতগুলোকে ঢেলে সাজাতে হবে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তলানিতে রয়েছে। এই স্থবিরতা কাটাতে সরকারের নেতৃত্বে উন্নয়ন বাজেটের আকার বড় করা প্রয়োজন। এর ফলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়লেও তা প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি যদি ২ শতাংশও বাড়ে, তবে তা অর্থনীতির জন্য মন্দ নয়; বরং এটি রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সাহায্য করবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি স্থবির এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বেশ কম। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে বিনিয়োগের হার জিডিপির বর্তমান ২৭-২৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে অন্তত ৩২ থেকে ৩৩ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।

অর্থ বিভাগের বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পর সরকার পরিচালনার দায়িত্বে এসে প্রথম বাজেটকে অর্থনীতির পুনর্গঠনের মজবুত ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান প্রধানমন্ত্রী। এমনকি ঈদের ছুটির মধ্যেও তিনি বাজেট নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছেন।

জানা গেছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বা ১৯ শতাংশ বেশি। তবে এই উচ্চাভিলাষী বাজেটের বিপরীতে আয়ের খাত নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। চলতি অর্থবছরেই সরকার রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতির মুখে পড়েছে, যার পরিমাণ গত ১০ মাসেই এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, একটি বাজেট মূলত ব্যয়, আয় ও ঘাটতির ত্রিমাত্রিক সমন্বয়ে গঠিত। নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের স্বার্থে বাজেটে ব্যয় বাড়াতে চাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক ও যৌক্তিক। তবে এই মুহূর্তে আমাদের সামনে মূল প্রশ্ন হলো এই বিশাল ব্যয়ের প্রয়োজনীয় অর্থ আসলে কোথা থেকে আসবে?

তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের অর্থনীতির আকার ও বাজেটের পরিধি ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও, সেই তুলনায় আমাদের রাজস্ব আহরণ কাক্সিক্ষত হারে বাড়ছে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রতি বছরই একটি বড় ধরনের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে, কিন্তু বছর শেষে তা অধরাই থেকে যায়। এই ব্যর্থতার পেছনে প্রধান কারণ হলো আমাদের সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অভাব।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বাজেট বাস্তবায়ন রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই কেবল অর্থনৈতিক নীতিমালাই যথেষ্ট নয়; রাজনৈতিক সুশাসন এবং অর্থনৈতিক সুশাসন এই দুই ধারাকে একসঙ্গে নিশ্চিত করতে পারলেই দেশের উন্নয়ন কাক্সিক্ষত গতিতে এগিয়ে যাবে।