যুক্তরাষ্ট্রের মাথাপিছু ঋণ বাংলাদেশের চেয়ে শতগুণের বেশি

বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বিপুল এই ঋণের কারণে দেশটির নাগরিকপ্রতি সরকারি ঋণের পরিমাণও এক লাখ ডলারের বেশি। অন্যদিকে বাংলাদেশের সরকারি ঋণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম হলেও রাজস্ব আয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার কারণে দেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি অনুভূত হচ্ছে।

২০২৬ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ফেডারেল ঋণ প্রায় ৩৯ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। জুনের হিসাব অনুযায়ী নাগরিকপ্রতি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ডলার।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে মোট সরকারি ঋণ ছিল প্রায় ২১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা ওই অর্থবছরের জিডিপির প্রায় ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একই অর্থবছরে শুধু বৈদেশিক ঋণের মাথাপিছু পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৫৪ দশমিক ৯০ ডলার, অর্থাৎ ১২২ টাকা বিনিময় হার ধরলে প্রায় ৭৯ হাজার ৮৯৮ টাকা।

মাথাপিছু ঋণে বিশাল ব্যবধান

যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকপ্রতি সরকারি ঋণ যদি প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ডলার ধরা হয় এবং বাংলাদেশের সর্বজনীন ঋণের মাথাপিছু হিসাব প্রায় ১ হাজার ডলারের কাছাকাছি হয়, তাহলে দুই দেশের মধ্যে ব্যবধান শতগুণেরও বেশি। তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—দুই দেশের ঋণের সংজ্ঞা, হিসাবের সময়কাল ও উৎস এক নয়। ফলে সরাসরি তুলনার ক্ষেত্রে একই ভিত্তির তথ্য ব্যবহার করা জরুরি।

যুক্তরাষ্ট্রের মোট ঋণের আকার যেমন বিশাল, তেমনি দেশটির অর্থনীতির আকারও অনেক বড়। মার্কিন সরকারের মোট ঋণ জিডিপির ১০০ শতাংশের অনেক ওপরে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ-জিডিপি অনুপাত ছিল প্রায় ১২৩ দশমিক ৩ শতাংশ।

অন্যদিকে বাংলাদেশের সরকারি ঋণ-জিডিপি অনুপাত ২০২৪ সালে প্রায় ৪০ শতাংশ ছিল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাম্প্রতিক হিসাবেও বাংলাদেশের সাধারণ সরকারের মোট ঋণ ২০২৬ সালে জিডিপির প্রায় ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

কেন যুক্তরাষ্ট্র এত ঋণ নিয়েও টিকে আছে?

বিশাল ঋণের অন্যতম বড় সুবিধা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হলো মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক অবস্থান। ডলার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বৈশ্বিক আর্থিক লেনদেনে প্রধান মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব মুদ্রায় ঋণ নিতে পারে এবং বিপুল পরিমাণ মার্কিন ট্রেজারি বন্ড আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করতে পারে।

মার্কিন ট্রেজারি নিজেই জানিয়েছে, সরকারের ব্যয় রাজস্বের চেয়ে বেশি হলে ঘাটতি পূরণে ট্রেজারি বন্ডসহ বিভিন্ন সরকারি সিকিউরিটিজ বিক্রি করে ঋণ নেওয়া হয়।

তবে এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ঋণ ঝুঁকিমুক্ত। ঋণের সঙ্গে সুদের ব্যয়ও বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে বড় বাজেট ঘাটতি থাকলে সরকারের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের সক্ষমতা কমতে পারে এবং ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধের জন্য আরও বেশি অর্থ বরাদ্দ করতে হতে পারে।

বাংলাদেশের চাপ অন্য জায়গায়

বাংলাদেশের ঋণের আকার যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক ছোট হলেও দেশের অর্থনীতির জন্য চাপের জায়গা ভিন্ন। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হলে একই পরিমাণ ডলার পরিশোধ করতে বেশি টাকা প্রয়োজন হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ ৬৫৪ দশমিক ৯০ ডলারে উঠেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। একই সময়ে বাংলাদেশের মোট সরকারি ঋণও বেড়ে ২১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের জন্য তাই শুধু ‘মাথাপিছু ঋণ’ দিয়ে দুই দেশের ঋণ পরিস্থিতি বিচার করা যথেষ্ট নয়। ঋণের পাশাপাশি জিডিপি, সরকারের রাজস্ব আয়, রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ঋণ পরিশোধের ব্যয় এবং অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বিবেচনা করতে হয়।

পরিবারের ঋণের হিসাবেও পার্থক্য

সরকারি ঋণের পাশাপাশি বাংলাদেশের সাধারণ পরিবারের ঋণ পরিস্থিতিও আলাদা বিষয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে (HIES)-এর মতো জরিপে পরিবারের ঋণ ও আয়-ব্যয়ের চিত্র পাওয়া যায়। কিন্তু পরিবারের গড় ঋণকে সরাসরি সরকারের মাথাপিছু ঋণের সঙ্গে তুলনা করা অর্থনৈতিকভাবে সমতুল্য নয়। কারণ একটি হলো সরকারের দায়, অন্যটি ব্যক্তি বা পরিবারের আর্থিক দায়।

অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকপ্রতি সরকারি ঋণ এক লাখ ডলারের বেশি হলেও সেটি কোনো মার্কিন নাগরিককে ব্যক্তিগতভাবে ওই পরিমাণ টাকা ব্যাংক বা সরকারকে পরিশোধ করতে হবে—এমন নয়। একইভাবে বাংলাদেশের মাথাপিছু সরকারি ঋণও ব্যক্তিগত ঋণ নয়।

ঋণের আকার নয়, পরিশোধের সক্ষমতাই বড় প্রশ্ন

অর্থনীতিতে একটি দেশের ঋণ কত বড়—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশটি সেই ঋণ কতটা সহজে পরিশোধ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির বিশাল আকার, ডলারের বৈশ্বিক চাহিদা এবং গভীর বন্ডবাজার দেশটিকে বড় ঋণ বহনের বিশেষ সক্ষমতা দিয়েছে।

বাংলাদেশের ঋণের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হলেও রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কম, বৈদেশিক মুদ্রার আয় সীমিত এবং ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার ওঠানামা করায় ঋণ পরিশোধের চাপ বেশি অনুভূত হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৫৬ লাখ এবং দেশটির অর্থনীতির আকার প্রায় ৪৯৯ বিলিয়ন ডলার।

সুতরাং ‘যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ বেশি, বাংলাদেশে কম’—এই তুলনা একাই কোনো দেশের অর্থনৈতিক ঝুঁকি নির্ধারণ করে না। বরং ঋণের বিপরীতে আয়, উৎপাদনক্ষমতা, রাজস্ব সংগ্রহ, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সক্ষমতাই নির্ধারণ করবে কোন দেশের ঋণ কতটা টেকসই।