ছেঁড়া-ফাটা নোট, সিল-স্বাক্ষর আর হিসাবের খাতা যেনো টাকা!

এক হাতে টাকা, অন্য হাতে বাজারের ব্যাগ। পকেট থেকে বের করতেই দেখা গেল—নোটটি ছেঁড়া, কোথাও স্ট্যাপলারের দাগ, কোথাও ব্যাংকের সিল, কোথাও কলমের আঁকিবুঁকি। কোনো নোটে দোকানের হিসাব, কোনো নোটে যোগ-বিয়োগ, আবার কোনো নোটে লেখা নাম, মোবাইল নম্বর কিংবা নানা ধরনের মন্তব্য।

কখনো নোটের এক প্রান্ত ছিঁড়ে গেছে, সেটি জোড়া দেওয়া হয়েছে টেপ দিয়ে। কোনোটি এতটাই ময়লা যে আসল রং বোঝাই কঠিন। আবার তুলনামূলক ভালো নোটেও দেখা যায় ব্যাংক শাখার সিল, স্বাক্ষর কিংবা হিসাবের চিহ্ন।

প্রশ্ন উঠছে, ব্যাংকনোট কি হিসাবের খাতা, নাকি দেশের অর্থনৈতিক লেনদেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম?

আরও বড় প্রশ্ন, ব্যাংকনোটের ওপর লেখা, সিল দেওয়া ও স্ট্যাপলিং নিষিদ্ধ বা নিরুৎসাহিত করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক নির্দেশনা থাকার পরও এসব চর্চা বন্ধ হচ্ছে না কেন?

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২১ সালের এক নির্দেশনায় নতুন ও পুনঃপ্রচলনযোগ্য ব্যাংকনোটের ওপর লেখা, সিল, স্বাক্ষর এবং নোটের প্যাকেটে অনিয়মিতভাবে স্ট্যাপলিং বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিল।

সেই নির্দেশনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্টভাবে বলেছিল, নোটের ওপর সরাসরি সংখ্যা, তারিখ, শাখার সিল, স্বাক্ষর বা অনুমোদন দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডের কারণে নোট তুলনামূলক দ্রুত অপ্রচলনযোগ্য হয়ে পড়ে। এতে গ্রাহক ভোগান্তির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় অর্থেরও অপচয় হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এটিকে ‘ক্লিন নোট পলিসি’ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছিল।

অর্থাৎ নিয়মটি নতুন নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কয়েক বছর আগেই বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করেছে।

তারপরও বাস্তব চিত্রে পরিবর্তন কতটা হয়েছে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

ব্যাংকিং ব্যবস্থায় টাকা গণনা, বান্ডিল তৈরি, সংরক্ষণ ও হস্তান্তরের সময় নোটের প্যাকেট শনাক্ত করার প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী এ জন্য সরাসরি প্রতিটি নোটে লেখা বা সিল দেওয়ার কথা নয়।

২০২১ সালের নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, নোট গণনার পর প্যাকেট ব্যান্ডিং করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখার নাম, সিল, গণনাকারীর স্বাক্ষর ও তারিখসহ লেবেল বা ফ্ল্যাপিং ব্যবহার করতে হবে। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় পরিচিতি নোটের গায়ে নয়, প্যাকেটের লেবেলে দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।

তবু বাজারে এমন নোট দেখা যায়, যার গায়ে ব্যাংকের সিল, স্বাক্ষর বা বিভিন্ন হিসাব লেখা রয়েছে।

এতে শুধু নোটের সৌন্দর্য নষ্ট হয় না; দীর্ঘমেয়াদে নোট দ্রুত ব্যবহারের অনুপযোগীও হয়ে যেতে পারে।

ব্যাংকনোটের অন্যতম বড় শত্রু হয়ে উঠেছে স্ট্যাপলার। নোটের বান্ডিল তৈরি করতে গিয়ে কখনো কখনো সরাসরি নোটের গায়ে স্ট্যাপলারের পিন ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। একটি পিন প্রথমে সামান্য ক্ষতি করলেও বারবার ভাঁজ, টানাটানি ও হাতবদলের ফলে সেই জায়গা দিয়ে নোট ছিঁড়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২১ সালের নির্দেশনায় নোটের প্যাকেটে সরাসরি স্ট্যাপলিং না করার বিষয়েও নির্দেশ দিয়েছিল।

অর্থাৎ নোট ছেঁড়ার একটি কারণ শুধু মানুষের অসাবধানতা নয়; প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার কিছু পদ্ধতিও এর আয়ু কমিয়ে দিতে পারে।

বাংলাদেশের বাজারে অনেক নোটের ওপর দেখা যায় যোগ-বিয়োগ, গুণ-ভাগ কিংবা পণ্যের হিসাব। দোকানদার পকেট থেকে একটি নোট বের করে তার ওপর লিখে রাখলেন—কত টাকা পাওনা, কত টাকা দেওয়া হয়েছে, কোন পণ্যের দাম কত। আবার কেউ হয়তো ফোন নম্বর লিখে রাখলেন। কেউ নিজের নাম বা স্বাক্ষর লিখলেন।

এসব কাজ সাময়িকভাবে সুবিধাজনক মনে হলেও নোটটি এরপর বহু মানুষের হাতে ঘুরতে থাকে।

একজনের হিসাব অন্যজনের হাতে গিয়ে অর্থহীন হয়ে যায়। কিন্তু কালি থেকে যায় নোটের গায়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৩ সালের পরিচ্ছন্ন নোট নীতিমালায় অধিক ময়লাযুক্ত, ছেঁড়া-ফাটা, অতিরিক্ত কালিযুক্ত, অধিক লেখাযুক্ত, স্বাক্ষরযুক্ত এবং বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত নোটকে বাজার থেকে প্রত্যাহারের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছিল।

একটি নতুন নোট বাজারে আসার পর সেটি কতদিন টিকে থাকবে, তা শুধু কাগজের মানের ওপর নির্ভর করে না। মানুষের ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ।

বারবার ভাঁজ করা, পকেটে চেপে রাখা, পানিতে ভেজা, ঘামে ভিজে যাওয়া, নোটের ওপর লেখা, স্ট্যাপলিং, টেপ লাগানো—সব মিলিয়ে নোটের আয়ু কমে।

বাংলাদেশের আর্দ্র আবহাওয়াও কাগজের নোটের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। ফলে একটি নোট যত বেশি হাতবদল হয় এবং যত বেশি অব্যবস্থাপনার শিকার হয়, তত দ্রুত সেটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত সেটি বাজার থেকে তুলে নিয়ে নতুন নোট দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে হয়।

ছেঁড়া বা অপ্রচলনযোগ্য নোট শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রা ব্যবস্থাপনার অংশ হয়ে যায়। পুরোনো ও অযোগ্য নোট প্রত্যাহার করে নতুন নোট দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে হয়।

এর সঙ্গে জড়িত থাকে মুদ্রণ, পরিবহন, সংরক্ষণ, বাছাই ও বিতরণের খরচ।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২১ সালের নির্দেশনাতেই বলেছিল, নোটে লেখা, সিল ও স্ট্যাপলিংয়ের মতো কর্মকাণ্ডের ফলে নোট অপেক্ষাকৃত কম সময়ে অপ্রচলনযোগ্য হয় এবং এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয়।

অর্থাৎ একটি নোটে অপ্রয়োজনীয়ভাবে কলম চালানো ব্যক্তিগতভাবে সামান্য ঘটনা হলেও হাজার হাজার বা লাখ লাখ নোটে একই ঘটনা ঘটলে এর অর্থনৈতিক প্রভাবও তৈরি হয়।

এখানে সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালে Bangladesh Bank Note Refund Regulations, 2025 জারি করে পুরোনো ২০১২ সালের প্রবিধান বাতিল করে। নতুন ব্যবস্থায় ব্যাংক শাখাগুলোকে ছেঁড়া-ফাটা, ত্রুটিপূর্ণ ও ময়লাযুক্ত নোটের বিনিময়মূল্য দেওয়ার সেবা নিয়মিতভাবে চালু রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, অপ্রচলনযোগ্য ও ছেঁড়া-ফাটা নোটের ক্ষেত্রে নোটটি আসল হিসেবে শনাক্ত করার মতো নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে এবং সাধারণ ক্ষেত্রে নোটের ৯০ শতাংশের বেশি অংশ অক্ষত থাকলে ব্যাংক শাখা থেকে পূর্ণ বিনিময়মূল্য দেওয়ার বিধান রয়েছে।

দাবিযোগ্য কিছু নোট অবশ্য শাখায় সরাসরি নিষ্পত্তি না করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে পাঠানোর নিয়ম রয়েছে।

অর্থাৎ ছেঁড়া নোট হাতে পড়লে সেটি নিয়ে ভোগান্তি পোহানোর পরিবর্তে নির্ধারিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিস্থাপনের সুযোগ রয়েছে।

ব্যাংকনোট নষ্ট হওয়ার জন্য শুধু সাধারণ মানুষকে দায়ী করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। ব্যাংক শাখায় টাকা গণনা, বান্ডিল করা, ক্যাশ কাউন্টার পরিচালনা, এটিএমে টাকা ভরা এবং গ্রাহকের কাছে নোট দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় পরিচ্ছন্ন নোট ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব রয়েছে।

বিশেষ করে এটিএম থেকে যদি বারবার অতিরিক্ত ময়লাযুক্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত নোট বের হয়, তাহলে গ্রাহকের প্রশ্ন থাকাটাই স্বাভাবিক—নোটটি মেশিনে ঢোকানোর আগেই কি যথাযথভাবে বাছাই করা হয়েছিল?

একইভাবে ব্যাংকের কর্মীরা যদি হিসাবের সুবিধার জন্য সরাসরি নোটে সিল বা লেখা ব্যবহার করেন, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাংকনোট ব্যবহারের সংস্কৃতি এক নয়। কোথাও কাগজের নোটে লেখা বা স্ট্যাপলিং তুলনামূলকভাবে বিরল, আবার কোথাও মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় প্লাস্টিক বা পলিমার নোটের ব্যবহার বেশি।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজ দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন নোটে অপ্রয়োজনীয় লেখা, সিল ও স্ট্যাপলিং থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে, তখন সেই নির্দেশ বাস্তবে কতটা মানা হচ্ছে।

প্রতি ঈদে বা বিশেষ সময়ে নতুন নোটের চাহিদা বাড়ে। নতুন নোট হাতে পেলে অনেকেই সেটি যত্ন করে রাখেন। কিন্তু কয়েক মাস পর একই নোট যখন বাজারে ঘুরতে থাকে, তখন তার গায়ে কলমের দাগ, সিল, হিসাব কিংবা নানা ধরনের চিহ্ন দেখা যায়।

এখানে সমস্যাটি শুধু নতুন নোট ছাপিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়।

নোটের আয়ু বাড়াতে হলে তিন পক্ষের আচরণ বদলাতে হবে— ব্যাংককে নোটে লেখা, সিল ও অনিয়মিত স্ট্যাপলিং বন্ধ করতে হবে। ব্যবসায়ীদের হিসাবের জন্য নোট ব্যবহার না করে খাতা, রসিদ বা ডিজিটাল ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হবে।

সাধারণ মানুষকে নোটে লেখা, আঁকিবুঁকি, অতিরিক্ত ভাঁজ, টেপ বা স্ট্যাপলিং থেকে বিরত থাকতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ছেঁড়া-ফাটা নোট প্রতিস্থাপন এবং পরিচ্ছন্ন নোট প্রচলনের জন্য একাধিক নির্দেশনা দিয়েছে। এখন প্রয়োজন সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন ও নিয়মিত নজরদারি।

কারণ একটি ব্যাংকনোট শুধু কাগজের টুকরো নয়। এটি প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষের লেনদেনের মাধ্যম এবং রাষ্ট্রের মুদ্রাব্যবস্থার অংশ।

নোটের ওপর একটি অপ্রয়োজনীয় দাগ হয়তো ব্যক্তিগতভাবে ছোট ঘটনা; কিন্তু কোটি কোটি নোটে একই অভ্যাস রাষ্ট্রের জন্য বড় খরচ তৈরি করতে পারে।