ভারত থেকে বাংলাদেশে ইলিশ আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। মৎস্য অধিদপ্তর ইলিশ আমদানির জন্য দেওয়া ১০৩টি অনাপত্তি সনদ (এনওসি) বাতিল করায় আমদানি প্রক্রিয়ায় এ স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনকের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে গত ২২ সেপ্টেম্বর ১০৩টি অনাপত্তি সনদ বাতিল করা হয়। এরপর থেকেই ভারত থেকে ইলিশ আমদানির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে হঠাৎ করে আমদানি বন্ধের সুনির্দিষ্ট কারণ মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন, আমদানি করা ভারতীয় ইলিশকে দেশীয় বা পদ্মার ইলিশ হিসেবে বিক্রি করে ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করা, কম মূল্য দেখিয়ে আমদানির মাধ্যমে অর্থ পাচারের সম্ভাবনা এবং দেশীয় ইলিশ উৎপাদনে জেলেদের আগ্রহ বাড়ানোর বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এসব কারণের কোনোটি মৎস্য অধিদপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
এদিকে আকস্মিকভাবে ইলিশ আমদানির অনুমতিপত্র (আইপি) বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে দাবি করেছেন আমদানিকারকেরা। তাদের ভাষ্য, আমদানির জন্য আগে থেকেই ক্রয় করা ইলিশ এখন কম দামে ফেরত দিতে হতে পারে।
বন্দর-সংশ্লিষ্টরা জানান, তুলনামূলক বেশি লাভের আশায় সাম্প্রতিক সময়ে ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বেড়েছিল। আমদানির সময় প্রতি কেজি ইলিশের মূল্য ৪৮ সেন্ট থেকে ২ মার্কিন ডলার পর্যন্ত দেখানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। নির্ধারিত রাজস্ব পরিশোধের পর এসব মাছ বন্দর থেকে খালাস করা হয়।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আমদানির ক্ষেত্রে প্রতি কেজি ইলিশের মূল্য প্রায় ৫০০ টাকা দেখানো হলেও দেশের বাজারে তা পদ্মার ইলিশ পরিচয়ে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করা হয়েছে। এ ধরনের অভিযোগের কারণে বাজারে ভারতীয় ও দেশীয় ইলিশ নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
সাধারণ ক্রেতা রহিম বলেন, আমদানি করা ভারতীয় ইলিশ দেখতে বাংলাদেশের পদ্মার ইলিশের সঙ্গে অনেকটা মিল রয়েছে। ফলে বাহ্যিক পার্থক্য বুঝতে না পেরে অনেকে দেশি ইলিশ মনে করে ভারতীয় ইলিশ কিনছেন। স্বাদে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও মাছ দেখতে প্রায় একই হওয়ায় ক্রেতাদের বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বাজার তদারকির সময় ভারতীয় ইলিশ বেশি দামে বিক্রির অভিযোগে কয়েকজন বিক্রেতাকে জরিমানা করার তথ্যও পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, বাজারে ভারতীয় ইলিশের সরবরাহ বেড়ে গেলে দেশীয় ইলিশ আহরণে জেলেদের আগ্রহ কমতে পারে। পাশাপাশি আমদানির প্রকৃত মূল্যের তুলনায় কম দাম দেখিয়ে ইলিশ আনা হলে ‘আন্ডার ইনভয়েসিং’-এর মাধ্যমে অর্থ পাচারের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও তাদের আশঙ্কা।
ইলিশ আমদানিকারক সৈয়েদ মহিদুল হক রুবাই বলেন, হঠাৎ আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তিনি বলেন, আমদানির জন্য ভারতে কেনা ইলিশ সেখানে পড়ে রয়েছে। এখন সেগুলো কম দামে ফেরত দিতে হবে। এর সঙ্গে আমদানি বাবদ করা ব্যয়ের ক্ষতিও রয়েছে।
বেনাপোলের মৎস্য ও মান নিয়ন্ত্রণ অফিসের পরিদর্শক আসাওয়াদুল ইসলাম বলেন, মৎস্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বন্ধ রয়েছে। আমদানি বন্ধ হওয়ায় বেনাপোলের বাজারেও ভারতীয় ইলিশের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। চলতি বছরে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ৫৩৫ টন ইলিশ আমদানি হয়েছে বলেও জানান তিনি।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশে মোট ১ হাজার ৭৩৯ দশমিক ৫০ টন ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে গতকাল পর্যন্ত বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ৫৩৫ টন ইলিশ দেশে এসেছে।
১০৩টি অনাপত্তি সনদ বাতিলের পর আগে দেওয়া অন্যান্য অনুমোদনের আওতায় ইলিশ আমদানি করা যাবে কি না, সে বিষয়ে পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা।