যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও কমেছে। প্রায় সাত মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের অবসানে আলোচনার সম্ভাবনাকে বিনিয়োগকারীরা সরবরাহ পরিস্থিতির জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন।
বুধবারের (২৩ সেপ্টেম্বর) লেনদেনে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্স ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ০৯ ডলার বা ১ দশমিক ১ শতাংশ কমে ৯৮ দশমিক ১৬ ডলারে নেমে আসে। অন্যদিকে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট—ডব্লিউটিআইয়ের দাম কমেছে ১ দশমিক ৫০ ডলার বা ১ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ব্যারেলপ্রতি ৮৯ দশমিক ০১ ডলারে।
এর আগে মঙ্গলবারও বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল। রয়টার্সের হিসাবে, সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন পুনরায় চালু হওয়া এবং ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার সম্ভাবনার খবরে ব্রেন্টের দাম একপর্যায়ে ১০০ ডলারের নিচে নেমে যায়।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কয়েক দফা যোগাযোগ হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তাদের বৈঠক ‘খুব ভালো’ ও ফলপ্রসূ হয়েছে। তবে আলোচনায় কী অগ্রগতি হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ জানিয়েছেন, মধ্যস্থতাকারীরা দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করেছেন এবং আলোচনার আরও পর্ব হতে পারে। ইরানের পক্ষ থেকেও হরমুজ প্রণালি, অবরোধ প্রত্যাহার ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাসহ কয়েকটি শর্ত নিয়ে আলোচনার কথা জানানো হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত চললেও দুই পক্ষের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনা তেলের ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ কিছুটা কমিয়েছে।
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বিশ্লেষক টিম ওয়াটারারের ভাষায়, কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে বাজার এখন বেশি আশাবাদী। নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের যোগাযোগ বাজারে একটি ‘আশার আলো’ তৈরি করেছে।
অর্থাৎ, কঠোর বক্তব্য ও সামরিক হুমকি অব্যাহত থাকলেও বাজার এখন সম্ভাব্য আলোচনার ফলাফলকে মূল্যায়নের মধ্যে রাখছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি। সংঘাতের কারণে এই জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমালে এবং ইরানি বন্দরের ওপর নৌ অবরোধ তুলে নিলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এটি এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নয় এবং দুই পক্ষের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন স্বাভাবিক হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়া ও অন্যান্য বাজারে সরবরাহ বাড়তে পারে। সেই প্রত্যাশাও সাম্প্রতিক সময়ে তেলের দামের ওপর নিম্নমুখী চাপ তৈরি করছে।
তেলের বাজারে স্বস্তির আরেকটি কারণ সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন পুনরায় চালু হওয়া। সেপ্টেম্বরের শুরুতে ড্রোন হামলার পর পাইপলাইনটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
রয়টার্স জানিয়েছে, পাইপলাইনটি পুনরায় চালু হওয়ার পর সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের দিকে তেল সরবরাহ আবার শুরু হয়েছে। পাইপলাইনটির সক্ষমতা দৈনিক ৭০ লাখ ব্যারেল; এর মাধ্যমে প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত তেল হরমুজ এড়িয়ে ইয়ানবু দিয়ে রপ্তানির সুযোগ রয়েছে।
তবে পাইপলাইনটি পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। হামলায় কয়েকটি পাম্পিং স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ধাপে ধাপে সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
হরমুজ ঘিরে ঝুঁকি বাড়ার পর উপসাগরীয় দেশগুলো তেল সরবরাহ সচল রাখতে বিকল্প ব্যবস্থাও গ্রহণ করছে। এর মধ্যে ওমানের উপকূলের কাছে জাহাজ থেকে জাহাজে—শিপ-টু-শিপ বা এসটিএস—তেল স্থানান্তর উল্লেখযোগ্য।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে উপসাগরীয় অঞ্চলে এসটিএস ব্যবস্থায় প্রায় ২৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রতিদিন স্থানান্তরের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা আগস্টের প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল দৈনিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি।
এ ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া ঠেকাতে সহায়তা করলেও পরিবহন ব্যয় অনেক বেড়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহের পরিমাণ কিছুটা স্থিতিশীল হলেও জ্বালানি বাণিজ্যের খরচ ও ঝুঁকি এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের বাজার একই সঙ্গে দুটি বিপরীত সংকেত মূল্যায়ন করছে। একদিকে সংঘাত, হরমুজের ঝুঁকি ও আঞ্চলিক হামলা সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার সম্ভাবনা, সৌদি রপ্তানি পুনরুদ্ধার এবং বিকল্প পরিবহনব্যবস্থা সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার আশা তৈরি করছে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও দেখা যাচ্ছে, সৌদি আরবের রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনা এবং ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ পুনরায় খোলার ইঙ্গিত তেলের বাজারে ঝুঁকি কমানোর প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত যুদ্ধবিরতি বা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা হয়নি। ফলে সামরিক পরিস্থিতির নতুন অবনতি, হরমুজে জাহাজ চলাচলে বাধা কিংবা আলোচনার ব্যর্থতা হলে তেলের বাজার আবার দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। বিপরীতে কূটনৈতিক অগ্রগতি এবং সরবরাহপথগুলো আরও স্বাভাবিক হলে বাজারে দাম কমার চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।
নতুন কোনো হামলা হলে জবাব হবে ‘চূড়ান্ত ও কঠোর’: আইআরজিসি
শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরে আলোচনায় যেসব বিষয় গুরুত্ব পাবে
ইরানকে ধ্বংসের হুমকি দিয়ে পেজেশকিয়ানকে বশে আনতে চাইছেন ট্রাম্প