সম্প্রতি ছাগলকাণ্ডে বহুল আলোচিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক কর্মকর্তা মতিউর রহমান ও তার স্ত্রী সন্তানদের বেনিফেশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বিএসইসির সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
ইতোমধ্যে মতিউরকে এনবিআর থেকে ওএসডি করা হয়েছে। একইসঙ্গে রাষ্ট্রায়াত্ব সোনালী ব্যাংকের পরিচালক পদ থেকে তাকে অপসারণ করা হয়েছে।
সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার (২৫ জুন) দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে বিএসইসিকে মতিউর রহমান ও তার স্ত্রী সন্তানদের বিও হিসাব স্থগিত করার জন্য একটি চিটি পাঠানো হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির তরফ থেকে তাদের বিও হিসাব স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল করিম আলোচিত মতিউর ও তার পরিবারের সদস্যদের বিও হিসাব স্থগিতের তথ্য নিশ্চিত করে দৈনিক খবর সংযোগকে বলেন, দুদক থেকে বিএসইসিকে মতিউর ও স্ত্রী-সন্তানদের বিও হিসাব স্থগিতের একটি চিঠি পাঠানো হয়। এরপরই বিএসইসি সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি অব বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) বরাবর তাদের বিও হিসাব স্থগিত করার নির্দেশ নেওয়া হয়েছে।
সিডিবিএল হলো- ইলেক্ট্রনিক শেয়ার সংরক্ষণ, লেনদেন নিষ্পত্তি ও শেয়ার হস্তান্তরের হালনাগাদ তথ্য ধারণ করে। একইসাথে ব্রোকারেজ হাউস প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় ও স্টক এক্সচেঞ্জ লেনদেন তথ্য সিডিবিএলের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়ে থাকে।
জানা গেছে, মতিউরের পরিবারের বিও হিসাব স্থগিত থাকায় তাদের সকল প্রকার শেয়ার কেনা-বেচা বন্ধ থাকবে। পাশাপাশি বিও হিসাবের অর্থ কোনভাবে উত্তোলন করাও যাবে না।
এদিকে আলোচিত এনবিআর কর্মকর্তা মতিউর রহমান ঘুষ, দুর্নীতি ও প্লেসমেন্ট শেয়ার ব্যবসা করে হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়েছেন- বলে অভিযোগ এনে বিভিন্ন গণমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ করেছে। তবে প্লেসমেন্ট শেয়ার ব্যবসা করার ক্ষেত্রে তিনি কোনো অনিয়ম করেছেন কি-না, সে বিষয়ে এখনও সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পায়নি শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
অভিযোগ হাতে পেলেই তার বিরুদ্ধে সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এসব কর্মকাণ্ডের বিষয়টি সামনে চলে আসে মূলত সম্প্রতি কোরবানির জন্য ঢাকার সাদিক এগ্রো থেকে ১৫ লাখ টাকায় একটি ছাগল কিনতে গিয়ে আলোচনার জন্ম দেন মতিউর রহমানের ছেলে মুশফিকুর রহমান ইফাত। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে বিভিন্ন আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে অভিযোগ সংক্রান্ত বিষয়গুলো আমলে নিয়ে মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার।
আলোচিত শেয়ার ব্যবসায়ী মতিউর রহমানকে ইতোমধ্যে এনবিআর থেকে ওএসডি করা হয়েছে, সেনালী ব্যাংকের পরিচালক পদ থেকে তাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
মতিউর রহমানকে নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি ঘুষ এবং শেয়ার ব্যবসা উভয় প্রক্রিয়ায় অঢেল টাকার মালিক বনে গেছেন। এখন পর্যন্ত শুধু প্রাইভেট প্লেসমেন্ট প্রক্রিয়ায় ২০ কোম্পানিতে নিজ নাম ছাড়াও স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, বোনসহ কয়েকজন নিকটাত্মীয় এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোম্পানির নামে ২০১০ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত শেয়ার নেওয়ার তথ্য মিলেছে।
মতিউর নিজের ও আত্মীয়স্বজনের নামে যে পরিমাণ প্লেসমেন্ট শেয়ার নিয়েছেন, অভিহিত বা প্রকৃত মূল্য হিসাবে এসব শেয়ারের দাম অন্তত অর্ধশত কোটি টাকা। এর দু-একটি বাদে সব কোম্পানি আগেই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। তালিকাভুক্তির পর প্লেসমেন্ট প্রক্রিয়ায় নেওয়া এসব শেয়ার উচ্চ মূল্যে বিক্রি করে কয়েকশ কোটি টাকা মুনাফা করেছেন মতিউর রহমান।
এদিকে মতিউর রহমান প্লেসমেন্ট প্রক্রিয়ায় যেসব শেয়ার পেয়েছেন, তার অনেকগুলোর বিরুদ্ধে আইপিও প্রক্রিয়ায় শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার আগে আর্থিক প্রতিবেদনে জালিয়াতি করে মুনাফা বাড়িয়ে দেখানোর অভিযোগ আছে। আর্থিক প্রতিবেদনে জালিয়াতি ঢাকতে এনবিআরে কর ও ভ্যাট দেওয়ার নথিও জাল করার প্রয়োজন পড়ে। যারা জাল-জালিয়াতিতে পূর্ণ আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করেন এবং যেসব কর্মকর্তা এ কাজে সহায়তা করেন, তাদের অধিকাংশই ঘুষের পরিবর্তে শেয়ার নেন। এতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মালিকপক্ষের নগদে অনেক টাকা বেচে যায়। আবার কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই ভুয়া শেয়ার নিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ শেয়ারবাজার থেকে হাতিয়ে নেন সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা। মতিউরের বিরুদ্ধেও এমন অভিযোগ রয়েছে- বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
বিভিন্ন মাধ্যম সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মতিউর প্লেসমেন্ট প্রক্রিয়ায় যেসব কোম্পানির শেয়ার নিয়েছেন- সেগুলো হলো– এক্মি পেসটিসাইডস (৩৮ লাখ শেয়ার), অনিক ট্রিমস (৫৩ লাখ ১৯ হাজার), অ্যাসোসিয়েটেড অক্সিজেন (১০ লাখ), বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার (৭৫ হাজার), সিএনএটেক্স (১০ লাখ ৩০ হাজার), ডমিনেজ স্টিল (১৫ লাখ ৮০ হাজার), ই-জেনারেশন (৫০ হাজার), ফরচুন সুজ (৪৩ লাখ ১০ হাজার), কাট্টলী টেক্সটাইল (২১ লাখ), লুব-রেফ বাংলাদেশ (৮ লাখ), মামুন এগ্রো (৩৭ লাখ ৮৭ হাজার), এমএল ডাইং (১৬ লাখ), রিং সাইন (১০ লাখ), এসকে ট্রিমস (৯০ লাখ), টেকনো ড্রাগস (১.৫০ লাখ), ওয়েব কোস্টস (১৩ লাখ ৯৭ হাজার) শেয়ার। প্যাসিফিক ডেনিম এবং সিলভা ফার্মার কিছু শেয়ারও আছে। এর মধ্যে এসকে ট্রিমস কোম্পানি নিজেই গড়েছেন মতিউর। তবে এর বাইরেও তার নামে আরও শেয়ার থাকতে পারে বলে জানা গেছে।
এরআগে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম জানিয়েছিলেন, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পেরেছি যে, মতিউর রহমান অনেক কোম্পানির প্লেসমেন্ট শেয়ারে বিনিয়োগ করেছেন। প্লেসমেন্ট শেয়ারের বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সজেচঞ্জ আইন, রুলস ও রেগুলেশনসের কোন বাধা নেই। ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান প্রাইভেট প্লেসমেন্টর মাধ্যমে শেয়ার অফার করলে, সেখানে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। তবে সেখানে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব প্রক্রিয়ায় (আইপিও) বা তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানির মূল্য সংবেদনশীল তথ্যের ভিত্তিতে লেনদেনের ক্ষেত্রে তার কোনো অনিয়ম রয়েছে কি-না সে বিষয়টি বিএসইসি দেখতে পারে। তবে বিএসইসির কাছে এখন পর্যন্ত এমন কোন তথ্য নেই। এ সংক্রান্ত কোনো অভিযোগও কমিশনে আসেনি। তবে তার বিরুদ্ধে যদি কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কমিশনে জমা পড়ে বা কোনো তদন্তকারী সংস্থা কমিশনের কাছে যদি তথ্য চায়, তখন প্রয়োজনে সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।