জাপান ভ্রমণে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে জরুরী শিষ্টাচার

সূর্যোদয়ের দেশ জাপান তার প্রাচীন মন্দির, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন জনজীবনের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তবে জাপানে ভ্রমণের সময় কেবল ভাষাগত সমস্যাই নয়, বরং দেশটির অনেক ‘অলিখিত’ সামাজিক নিয়মের কারণে পর্যটকরা মাঝে মাঝে বিপাকে পড়তে পারেন। জাপানি সাংবাদিক মিজুকি উচিয়ামা, যিনি টোকিও ও ওসাকায় এক দশকেরও বেশি সময় কাটিয়েছেন, পর্যটকদের সুবিধার্থে জাপানি সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ ১০টি শিষ্টাচার তুলে ধরেছেন।

চপস্টিক ও বাটি ব্যবহারের নিয়ম

খাবারের টেবিলে চপস্টিক কখনোই ভাতের বাটিতে খাড়া করে গেঁথে রাখবেন না। এটি জাপানি শেষকৃত্যানুষ্ঠানের ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত এবং ডাইনিং টেবিলে অত্যন্ত অশুভ মনে করা হয়। এছাড়া খাওয়ার সময় প্লেটের ওপর ঝুঁকে পড়ার বদলে স্যুপ বা ভাতের বাটি মুখের কাছে তুলে নিয়ে খাওয়াটাই জাপানি সংস্কৃতিতে মার্জিত।

শব্দ করে খাওয়া বা ‘স্লার্পিং’

পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে স্যুপ খাওয়ার সময় শব্দ করা অভদ্রতা হলেও জাপানে রামেন বা উদন খাওয়ার সময় সজোরে শব্দ করা বা ‘স্লার্পিং’ করাকে রাঁধুনির প্রতি এক ধরণের সম্মান হিসেবে দেখা হয়। এতে খাবারের স্বাদ ও সুগন্ধ আরও ভালোভাবে উপভোগ করা যায় বলে মনে করা হয়।

রেস্তোরাঁয় প্রয়োজনীয় কিছু শব্দ

রেস্তোরাঁয় ওয়েটারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে উচ্চস্বরে না ডেকে বিনীতভাবে ‘সুমিমাসেন’ (Sumimasen- মাফ করবেন) বলুন। কোনো কিছুর অর্ডার করার সময় শেষে ‘ওনেগাইশিমাসু’ (Onegaishimasu- দয়া করে) শব্দটি যুক্ত করুন। এছাড়া খাওয়ার আগে ‘ইতাদাকিমাসু’ এবং খাওয়া শেষে ‘গোচিসৌসামা’ (ধন্যবাদ) বললে জাপানিরা আপনাকে একজন সচেতন ও রুচিশীল অতিথি হিসেবে গণ্য করবে।

টিপস দেওয়ার প্রয়োজন নেই

জাপানে বকশিস বা টিপস দেওয়ার কোনো সংস্কৃতি নেই। অতিরিক্ত টাকা দিলে তা কৃতজ্ঞতার বদলে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। সেখানে ভালো সেবা দেওয়াকে দায়িত্বের অংশ মনে করা হয়। এছাড়া খাওয়ার পর প্লেট পরিষ্কার রাখা বা পুরো খাবার শেষ করা বিনয়ের লক্ষণ।

সব সময় উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই

জাপানের কোনো দোকানে প্রবেশ করলে কর্মীরা সমস্বরে ‘ইরাশ্যইমাসে’ (Irasshaimase- স্বাগতম) বলে চিৎকার করে ওঠে। এটি কেবল আপনাকে স্বাগত জানানোর একটি মাধ্যম। এর উত্তরে উচ্চস্বরে কিছু বলার প্রয়োজন নেই; কেবল একটি ছোট মাথা নাড়ানো বা মুচকি হাসিতেই তারা খুশি হয়।

গণপরিবহনে নিরবতা বজায় রাখুন

জাপানের ট্রেন বা বাসকে অত্যন্ত শান্ত ও পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গণপরিবহনে ফোনে কথা বলা বা উচ্চস্বরে গল্প করা অত্যন্ত অভদ্রতা। ফোন সাইলেন্ট মোডে রাখুন এবং প্রয়োজনে হেডফোন ব্যবহার করুন।

রাস্তায় খাওয়া নিষিদ্ধ

জাপানের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে খাবার খাওয়া বা স্নাকিং করাকে অভদ্রতা মনে করা হয়। খাবার কেনার পর সেখানেই দাঁড়িয়ে শেষ করুন অথবা কোনো পার্ক বা নির্দিষ্ট বসার জায়গায় গিয়ে খান। তবে দূরপাল্লার ট্রেন বা শিনকানসেনে খাবার খাওয়া বৈধ।

নিজের বর্জ্য নিজেই বহন করুন

জাপানের রাস্তায় ডাস্টবিন খুব একটা দেখা যায় না। এর কারণ জাপানিরা নিজেদের ময়লা নিজেরাই ব্যাগে করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। রাস্তায় কোনো ময়লা ফেলবেন না। ডাস্টবিনের প্রয়োজন হলে কনভিনিয়েন্স স্টোর বা রেল স্টেশনে খুঁজুন।

অনসেন বা গরম পানির প্রস্রবণ

জাপানিদের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী অনসেনে (Onsen) নামার আগে কিছু নিয়ম মানা বাধ্যতামূলক। অনসেনে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে নামতে হয় (ব্যতিক্রম ছাড়া)। সেখানে প্রবেশের আগে শরীর ভালোভাবে সাবান দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। এছাড়া যাদের শরীরে ট্যাটু আছে, অনেক ক্ষেত্রে তাদের প্রবেশাধিকার সীমিত থাকতে পারে, যদিও এখন নিয়ম কিছুটা শিথিল হচ্ছে।

এস্কেলেটরে দাঁড়ানোর নিয়ম

জাপানের শহরভেদে এস্কেলেটরে দাঁড়ানোর নিয়ম ভিন্ন। টোকিওসহ পূর্ব জাপানে মানুষ বাম দিকে দাঁড়ান এবং ডান দিকটি অন্যদের যাতায়াতের জন্য ফাঁকা রাখেন। আবার ওসাকাসহ পশ্চিম জাপানে নিয়মটি ঠিক উল্টো। আপনার যদি বিভ্রান্তি হয়, তবে স্রেফ সামনের মানুষটিকে অনুসরণ করুন।