ইরান যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহ শেষে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন যা তার হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী, মিত্রদেশগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং যুদ্ধের স্থায়িত্ব নিয়ে তার দেওয়া স্বল্পমেয়াদী অভিযানের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও এ অঞ্চলে আরও অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি চলছে।
এদিকে বিপর্যস্ত ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী সুরক্ষায় সহায়তায় অস্বীকার করায় ন্যাটো দেশগুলোকে ‘কাপুরুষ’ আখ্যা দিয়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযান চলছে বলে দাবি করেছেন।
শুক্রবার তার ঘোষণা অনুয়ায়ী ‘সামরিকভাবে যুদ্ধ জয় হয়েছে’ যা বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ ইরান এখনো অবাধ্য এবং তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করার পাশাপাশি পুরো অঞ্চলজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বোকামি পূর্ণ’ সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে দূরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে তিনি নিজের শুরু করা এই সংঘাতের ফলাফল বা বার্তা কোনোটির ওপরই নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছেন না। একটি স্পষ্ট প্রস্থান কৌশলের (exit strategy) অভাব। যা তার রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি এবং আসন্ন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির রাজনৈতিক সম্ভাবনার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
সাবেক মধ্যপ্রাচ্য আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ‘ট্রাম্প নিজেই নিজের জন্য 'ইরান যুদ্ধ' নামক একটি খাঁচা তৈরি করেছেন এবং তিনি এখন বুঝতে পারছেন না কীভাবে এটি থেকে বের হবেন। এটাই তার বর্তমান হতাশার সবচেয়ে বড় উৎস।’
এদিকে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, ইরানের অনেক শীর্ষ নেতাকে নির্মূল করা হয়েছে, তাদের নৌবাহিনীর বেশিরভাগ অংশ ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ব্যাপকভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। ওই কর্মকর্তার মতে, ‘এটি একটি অবিসংবাদিত সামরিক সাফল্য।’
ট্রাম্পের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা
এদিকে গত এক সপ্তাহে ট্রাম্পের কূটনৈতিক, সামরিক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। হোয়াইট হাউসের সূত্রমতে, হরমুজ প্রণালীতে নৌবাহিনী পাঠাতে ন্যাটো সদস্য ও অন্যান্য বিদেশি অংশীদারদের অনীহা ট্রাম্পকে অপ্রস্তুত করে দিয়েছে।
একই সাথে ইসরাইলের সাথেও মতপার্থক্য দেখা দিচ্ছে। ইরানের ‘সাউথ পারস’ গ্যাস ক্ষেত্রে ইসরাইলি হামলার বিষয়ে ট্রাম্প আগাম কিছু জানতেন না বলে দাবি করলেও, ইসরাইলি কর্মকর্তারা বলছেন, এই হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমন্বয় করেই করা হয়েছিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প এখন ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-র এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছেন যেখান থেকে কোনো পথই পরিষ্কার নয়। তিনি চাইলে আক্রমণ আরও তীব্র করতে পারেন, এমনকি ইরানের তেল হাব ‘খার্গ দ্বীপ’ দখল বা উপকূলীয় এলাকায় স্থল সৈন্য নামাতে পারেন; কিন্তু এতে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়বে যা মার্কিন জনগণ পছন্দ করবে না। আবার তিনি যদি এখন বিজয় ঘোষণা করে সরে আসেন, তবে উপসাগরীয় মিত্ররা একটি আহত ও শত্রুভাবাপন্ন ইরানের সামনে একা হয়ে পড়বে।
ভুল হিসাবনিকাশ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রশাসনের ভেতরে এই উপলব্ধি বাড়ছে যে, যুদ্ধের পরিণতি সম্পর্কে আগে থেকে আরও ভালোভাবে পরিকল্পনা করা উচিত ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় ভুল হিসাব ছিলো অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ইরান কতটা কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাবে তা বুঝতে না পারা। তেহরান তাদের অবশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন বহর নিয়ে পাল্টাহুঙ্কার দিচ্ছে, যার ফলে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহের পথ হরমুজ প্রণালী প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
ওবামা প্রশাসনের সাবেক উপদেষ্টা ব্রেট ব্রুয়েন বলেন, ‘ট্রাম্প এখন খবরের শিরোনাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না, কারণ তিনি এই যুদ্ধের কারণ এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারছেন না। মনে হচ্ছে তিনি তার বার্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন।’ সূত্র: রয়টার্স