গণহত্যাকারী ইসরায়েল ও তাদের সহযোগী যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের মুখে কঠিন এক চাল দিয়েছে ইরান। বিশ্বের জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র। এতে বিশ্ববাজারে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে।
এখন তারা এই সমুদ্রপথে শত্রু রাষ্ট্রের নৌযান চলাচল বন্ধ করে দিয়ে টোল আদায় শুরু করেছে। যারা তেহরানের অনুমতি নিয়ে হরমুজে ঢুকছে তারাই শুধু তেল নিয়ে আরব সাগরে বেরিয়ে আসতে পারছে, অন্যরা আক্রান্ত হচ্ছে। এতে এই পানিপথে চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পরও জ্বালানির দাম বাড়বে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ যে সমুদ্রপথ দিয়ে পার হয়, সেই পথটি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এটিকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধের ফলাফল।
কারণ, চলমান যুদ্ধে এই সমুদ্রপথকে ভূ-রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান। বর্তমানে এই সরু পানিপথের আশেপাশে প্রায় ২ হাজার জাহাজ আটকা পড়ে আছে, যা ইরানের উত্তর পাশে এবং ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দক্ষিণ পাশের মাঝে অবস্থিত।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, বিশ্বের এই একক গুরুত্বপূর্ণ তেলপথ দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে টোল বা শুল্ক আদায়ের জন্য দেশটির পার্লামেন্ট একটি আইন পাসের চেষ্টা করছে।
ইরানের তসনিম এবং ফার্স নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পার্লামেন্টের সিভিল অ্যাফেয়ার্স কমিটির চেয়ারম্যানকে উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে যে একটি খসড়া আইন তৈরি করা হয়েছে এবং শিগগিরই তা ইসলামিক কনসালটেটিভ অ্যাসেম্বলির লিগ্যাল টিমের মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে।
একজন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হওয়া জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ইরানকে অবশ্যই ফি বা শুল্ক আদায় করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটি খুবই স্বাভাবিক। অন্যান্য করিডোর বা স্থলপথের মতোই যখন পণ্য একটি দেশের মধ্য দিয়ে যায়, তখন শুল্ক দিতে হয়। হরমুজ প্রণালিও একটি করিডোর। আমরা এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি, এবং জাহাজ ও ট্যাঙ্কারগুলো আমাদের শুল্ক দেবে এটাই স্বাভাবিক।’
তবে এই অভ্যন্তরীণ আইনি কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ইতোমধ্যে সেখানে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি ‘টোল বুথ’ ব্যবস্থা চালু করেছে বলে বুধবার নামী শিপিং জার্নাল ‘লয়েডস লিস্ট’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
এর আগে একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে যে, ইরান প্রতি জাহাজ থেকে দুই মিলিয়ন বা ২০ লাখ ডলার করে টোল আদায় করছে। একবারের যাত্রায় এই পরিমাণ ফি দিতে হচ্ছে জ্বালানিবাহী জাহাজ বা ট্যাঙ্কারগুলোকে।
কেন ইরান টোল আদায়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে
ইরানের আঞ্চলিক পানিসীমা এই প্রণালি পর্যন্ত বিস্তৃত। তারা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আগ্রাসনের শিকার হওয়ার পর থেকেই উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে বিশ্বের বাকি অংশে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহনকারী জাহাজের পথ বন্ধ করে দিয়েছে।
এই পদক্ষেপ বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের উপরে নিয়ে গেছে, যা যুদ্ধের আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। এতে বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো জ্বালানি রেশনিং করতে এবং শিল্প উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে।
টোল আদায়ের প্রক্রিয়াটি কী
যদিও ইরানি পার্লামেন্ট এখনও টোল সংক্রান্ত আইন পাস করেনি, ‘লয়েডস লিস্ট’ বুধবার জানিয়েছে যে, গত দুই সপ্তাহে প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী ২৬টি জাহাজ আইআরজিসির ‘টোল বুথ’ ব্যবস্থার অধীনে একটি পূর্ব-অনুমোদিত রুট অনুসরণ করেছে, যার জন্য জাহাজ অপারেটরদের একটি যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
এই জাহাজগুলো চলাচলের সময় তাদের এআইএস সচল রাখেনি। নতুন এই ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত সূত্রগুলো লয়েডস লিস্টকে জানিয়েছে, প্রণালি পার হওয়ার জন্য জাহাজ অপারেটরদেরকে প্রথমে আইআরজিসির সঙ্গে যুক্ত মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয় এবং জাহাজের সব বিস্তারিত তথ্য জমা দিতে হয়।
এর মধ্যে রয়েছে নথিপত্র, আইএমও নম্বর, কী পণ্য বহন করা হচ্ছে, ক্রুদের নাম এবং জাহাজের গন্তব্যস্থল। এই মধ্যস্থতাকারীরা তখন তথ্যগুলো আইআরজিসির নৌ কমান্ডের কাছে জমা দেয়, যারা তথ্যগুলো যাচাই করে।
যদি জাহাজটি এই স্ক্রিনিংয়ে উত্তীর্ণ হয়, তবে আইআরজিসি একটি ক্লিয়ারেন্স কোড এবং কোন রুট দিয়ে জাহাজটি যাবে তার নির্দেশনা দেয়। একবার জাহাজটি প্রণালিতে প্রবেশ করলে আইআরজিসি কমান্ডাররা ভিএইচএফ রেডিওর মাধ্যমে উচ্চস্বরে জাহাজের ক্লিয়ারেন্স কোড জানতে চান।
জাহাজটি উত্তর দেয় এবং অনুমতি পেলে ইরানের একটি বোট এসে জাহাজটিকে লারাক দ্বীপের আশেপাশে তাদের আঞ্চলিক জলসীমা দিয়ে পাহারা দিয়ে পার করে দেয়। আর যদি কোনও জাহাজ আইআরজিসির স্ক্রিনিং টেস্টে উত্তীর্ণ না হয়, তবে তাদের প্রবেশাধিকার দেওয়া হয় না।
গত মঙ্গলবার আইআরজিসি নৌবাহিনীর কমান্ডার আলিরেজা তাংসিরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্টে জানিয়েছিলেন যে, ‘সেলেন’ নামে একটি কনটেইনার জাহাজকে ‘আইনি প্রোটোকল না মানা এবং অনুমতি না থাকার কারণে’ হরমুজ প্রণালি থেকে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেছিলেন, ‘এই জলপথ দিয়ে যে কোনো জাহাজ পারাপারের জন্য ইরানের মেরিটাইম অথরিটির সঙ্গে পূর্ণ সমন্বয় প্রয়োজন।’
ইসরাইল বৃহস্পতিবার দাবি করেছে যে, তারা বুধবার রাতে এক বিমান হামলায় তাংসিরিসহ নৌ-কমান্ডের ‘উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের’ হত্যা করেছে। ইরান অবশ্য এ বিষয়ে এখনও কোনও মন্তব্য করেনি।
কারা এই টোল পরিশোধ করছে
ইরান বলেছে যে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলো বাদে বাকি সবার জন্য হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত। গত মঙ্গলবার আইএমও-র ১৭৬টি সদস্য দেশের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ইরান জানায়: ‘মিত্র ভাবাপন্ন জাহাজগুলো, যার মধ্যে অন্য রাষ্ট্রগুলোর মালিকানাধীন বা সংশ্লিষ্ট জাহাজও রয়েছে, তারা যদি ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে অংশ না নেয় বা সমর্থন না দেয় এবং ঘোষিত নিরাপত্তা বিধিগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে মেনে চলে, তাহলে তারা সংশ্লিষ্ট ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ যাতায়াতের সুবিধা ভোগ করতে পারবে।’
লয়েডস লিস্টের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত মালয়েশিয়া, চীন, মিশর, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতের কিছু জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
অন্তত দুটি জাহাজ চীনের মুদ্রা ‘ইউয়ান’-এ টোল পরিশোধ করেছে। লয়েডস লিস্ট সোমবার জানায় যে, একটি ‘পারাপারের মধ্যস্থতা করেছে একটি চীনা মেরিটাইম সার্ভিস কোম্পানি, যারা ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছে পেমেন্টটিও হ্যান্ডেল করেছে।’
তবে জাহাজগুলো ঠিক কত অর্থ দিয়েছে তা স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে, ভারত সরকার দাবি করেছে যে, তাদের পক্ষ থেকে ইরানকে কোনও অর্থ দেওয়া হয়নি।
ভারতের বন্দর ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সচিব রাজেশ কুমার সিনহা মঙ্গলবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য কোনও অনুমতির প্রয়োজন নেই। সেখানে চলাচলের স্বাধীনতা রয়েছে। যেহেতু প্রণালিটি সরু, তাই শুধু প্রবেশ এবং বের হওয়ার পথগুলো চিহ্নিত করা থাকে যা শিপিং লাইনগুলোকে মেনে চলতে হয়। এটি চার্টারার এবং শিপিং কোম্পানির সিদ্ধান্ত যে তারা কখন চলবে বা চলবে না।’