ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেলের নৌপথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি সরবরাহ স্থবির হয়ে পড়েছে। এই অভাব মেটাতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) তাদের জরুরি মজুদ থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়লেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। আকাশচুম্বী দাম এবং ঘাটতির কারণে বিশ্ব অর্থনীতি এখন চরম বিশৃঙ্খলার মুখে।
যুক্তরাষ্ট্র সংকটের মুখে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পগুলো স্থগিত করে "drill, baby, drill" নীতির মাধ্যমে জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনে মনোযোগ দিয়েছে। এমনকি বায়ুকল প্রকল্প বন্ধ করতে ফরাসি কোম্পানিকে মোটা অঙ্কের অর্থও প্রদান করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ইউরোপের চিত্রটি মিশ্র; ইইউ একদিকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির কথা বলছে, অন্যদিকে জার্মানি ও ইতালির মতো দেশগুলো বাধ্য হয়ে বন্ধ হতে যাওয়া কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পুনরায় সচল রাখছে। লিথুয়ানিয়া ও স্লোভেনিয়ার মতো দেশগুলো গণপরিবহনে ছাড় এবং পাম্পে জ্বালানি রেশনিং শুরু করেছে।
জ্বালানি সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এশিয়া। ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া তাদের পরিবেশগত লক্ষ্যমাত্রা শিথিল করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফিরেছে। বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড এবং ফিলিপাইনেও কয়লার ব্যবহার বেড়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। থাইল্যান্ডে সরকারি কর্মকর্তাদের টাই বর্জন ও ছোট হাতার শার্ট পরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে এসির ব্যবহার কমানো যায়। শ্রীলঙ্কা প্রবর্তন করেছে চার দিনের কর্মসপ্তাহ এবং কঠোর জ্বালানি রেশনিং। ভিয়েতনাম কর্মীদের ঘরে বসে কাজ করার (Work from home) উৎসাহ দিচ্ছে।
আফ্রিকার দেশগুলো সার ও জ্বালানির উচ্চমূল্যে খাদ্য সংকটের ঝুঁকিতে রয়েছে। ইথিওপিয়া ও তানজানিয়া তাদের কৌশলগত মজুদ এবং ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। দক্ষিণ আমেরিকায় ব্রাজিল তাদের আখ থেকে উৎপাদিত ইথানল ব্যবহার করে সংকটের ধাক্কা সামলে নিয়েছে, কিন্তু চিলির মতো দেশগুলো বৈশ্বিক বাজারের সাথে তাল মেলাতে তেলের দাম অস্বাভাবিক বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।
বর্তমান সংকট প্রমাণ করেছে যে, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তাকে ধসিয়ে দিতে পারে। একদিকে দেশগুলো টিকে থাকতে কয়লার মতো দূষণকারী জ্বালানিতে ফিরছে, অন্যদিকে উচ্চমূল্য এড়াতে বাধ্য হয়ে বদলে ফেলছে তাদের প্রাত্যহিক জীবনধারা ও কাজের সংস্কৃতি।