যুক্তরাষ্ট্র জার্মানি থেকে পাঁচ হাজার সেনা প্রত্যাহারের যে ঘোষণা দিয়েছে, সেটি 'অনুমিত' অর্থাৎ আগে থেকেই অনুমান করা হচ্ছিল বলে মন্তব্য করেছেন জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী। অন্যদিকে ন্যাটো বলেছে, তারা এই বিষয়ে ওয়াশিংটনের কাছে ব্যাখ্যা চাইবে।
ডিপিএ সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস আরও বলেছেন, 'ইউরোপে, বিশেষ করে জার্মানিতে আমেরিকান সৈন্যদের উপস্থিতি আমাদের স্বার্থে এবং যুক্তরাষ্ট্রেরও স্বার্থ।'
এদিকে ন্যাটোর মুখপাত্র অ্যালিসন হার্ট বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বিস্তারিত জানতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করছে।
ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপটি এসেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেৎসের সমালোচনা করার পর, কারণ তিনি বলেছিলেন, চলমান যুদ্ধে ইরানের আলোচকদের কাছে যুক্তরাষ্ট্র 'অপমানিত' হয়েছে।
জার্মানিতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৬ হাজারের বেশি সক্রিয় সেনা সদস্য রয়েছে, যা ইউরোপে সবচেয়ে বেশি। এছাড়া ইতালিতে প্রায় ১২ হাজার ও যুক্তরাজ্যে ১০ হাজার সেনা রয়েছে।
জার্মানিতে সেনা কমানোর বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শনিবার ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, 'আমরা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাব এবং আমরা ৫ হাজারের চেয়েও অনেক বেশি কমাতে যাচ্ছি।' তবে তিনি এ বিষয়ে আর বিস্তারিত কিছু জানাননি।
গত বছর ওয়াশিংটন রোমানিয়ায় তাদের সেনা উপস্থিতি কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রতিশ্রুতির কেন্দ্র ইউরোপ থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সরিয়ে নিতে ট্রাম্পের পরিকল্পনার অংশ।
বর্তমানে ৩২ সদস্যের ন্যাটো জোটের ভেতরে উদ্বেগ বাড়ছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ সিদ্ধান্তটি সংস্থাটিকে দুর্বল করে দিতে পারে।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক শনিবার সতর্ক করে বলেছেন, 'ট্রান্সআটলান্টিক সম্প্রদায়ের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি বাইরের শত্রুরা নয়, বরং আমাদের জোটের চলমান ভাঙন।'
তিনি আরও বলেন, 'এই বিপর্যয়কর প্রবণতা পাল্টানোর জন্য আমাদের সবার যা কিছু করা দরকার, তা করতে হবে।'
এদিকে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির দুইজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন আইনপ্রণেতা বলেছেন যে, তারা 'জার্মানি থেকে একটি মার্কিন ব্রিগেড প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন'।
সিনেটর রজার উইকার এবং প্রতিনিধি মাইক রজার্স বলেন, 'পুরো মহাদেশ থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ার বদলে, ইউরোপে শক্তিশালী প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখা উচিত যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে।' তারা যথাক্রমে সেনেট ও হাউজ আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান।
শনিবার দ্বীপীয়ে-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস আরও বলেন, ইউরোপকে তার নিরাপত্তার জন্য আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে এবং বার্লিন এখন মহাদেশের মিত্রদের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে।
তিনি বলেন, 'জার্মানি সঠিক পথে রয়েছে' এবং একই সাথে উল্লেখ করেন যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার দেশ সামরিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।
এর আগে ট্রাম্প জার্মানিকে 'দায়িত্বহীন' বলে অভিযুক্ত করেছিলেন, কারণ তাদের সামরিক ব্যয় নেটোর নির্ধারিত লক্ষ্য (মোট দেশজ উৎপাদনের বা জিডিপির ২%) এর অনেক নিচে ছিল।
তবে ফ্রিডরিখ মেৎস সরকারের অধীনে এই অবস্থার আমূল পরিবর্তন হয়েছে এবং ধারণা করা হচ্ছে ২০২৭ সালে জার্মানি প্রতিরক্ষায় ৯১ বিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করবে।
সামগ্রিকভাবে জার্মানির প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৩ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ইউক্রেনকে বার্লিনের চলমান সহায়তা ও অন্যান্য প্রতিরক্ষা তহবিল রয়েছে।
শনিবার এক্স-এ দেওয়া পোস্টে নেটোর অ্যালিসন হার্ট বলেন, জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি 'ইউরোপের জন্য প্রতিরক্ষায় আরও বেশি বিনিয়োগ করা এবং আমাদের যৌথ নিরাপত্তার দায়িত্বে বড় অংশ গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে'।
তিনি আরও বলেন, 'গত বছর দ্যা হেগে অনুষ্ঠিত নেটও সম্মেলনে মিত্ররা জিডিপির ৫ শতাংশ বিনিয়োগে সম্মত হওয়ার পর থেকে আমরা ইতোমধ্যে অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি।'
ফ্রিডরিখ মেৎস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বলেছেন, 'আমেরিকানদের স্পষ্টতই কোনো কৌশল নেই।'
তিনি বলেছেন, 'ইরানিরা স্পষ্টতই আলোচনায় খুব দক্ষ কিংবা বলা ভালো যে তারা আলোচনা না করায় খুব দক্ষ। তারা আমেরিকানদের ইসলামাবাদে যেতে দেয় এবং কোনো ফলাফল ছাড়াই আবার ফিরে আসতে বাধ্য করে।'
'পুরো জাতি ইরানের দ্বারা অপমানিত হচ্ছে,' বলেছেন তিনি। এর জবাবে ট্রাম্প তার প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, মেৎস মনে করেন 'ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকা ঠিক আছে এবং তিনি কী বলছেন তা জানেন না।'
এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে। পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল জানান, এই নির্দেশটি প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের কাছ থেকে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, 'আমরা আশা করছি আগামী ছয় থেকে বারো মাসের মধ্যে এই প্রত্যাহার সম্পন্ন হবে।'
ন্যাটো জোটের দীর্ঘদিনের সমালোচক ট্রাম্প গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালি আবার চালু করার অভিযানে অংশ নিতে মিত্রদের অনীহার কারণে তাদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার পর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে ইরান।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর একটি নৌ অবরোধ আরোপ করেছে। সূত্র: বিবিসি বাংলা