পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পরপরই প্রশাসনিক সংস্কার ও কর্মসংস্কৃতি ফেরাতে বড় পদক্ষেপ নিল নতুন বিজেপি সরকার। রাজ্যে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ঈদুল আজহার (বকরি ঈদ) দুই দিনের সরকারি ছুটি কমিয়ে এবার মাত্র এক দিন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নবান্ন।
নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
পাশাপাশি, এই সিদ্ধান্তের পর জোর চর্চা শুরু হয়েছে—তবে কি এবার দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটির সংস্কৃতিতেও কোপ পড়তে চলেছে?
ঈদের ছুটি নিয়ে নবান্নের নতুন নির্দেশিকা
শনিবার নবান্ন থেকে জারি করা একটি সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আগামী ২৮ মে (বৃহস্পতিবার) বকরি ঈদ উপলক্ষে রাজ্যে একদিন সাধারণ ছুটি থাকবে।
এর আগে পূর্বতন সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৬ ও ২৭ মে দু'দিন ছুটির কথা ছিল। কিন্তু নতুন নির্দেশিকায় আগের সিদ্ধান্ত বাতিল করে ছুটি কমিয়ে এক দিন করা হয়েছে।
প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করেই ঈদের সঠিক তারিখ নির্ধারিত হয়। তাই ধর্মীয় ক্যালেন্ডারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এই পরিবর্তন।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি কেবল তারিখ পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে রয়েছে গভীর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বার্তা।
'ছুটির রাজ্য' তকমা ঘোচাতে মরিয়া শুভেন্দু অধিকারী
দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধী দলগুলো পশ্চিমবঙ্গকে ‘ছুটির রাজ্য’ বলে কটাক্ষ করে আসছিল। বিশেষ করে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে বিভিন্ন ছোট-বড় উৎসব উপলক্ষে অতিরিক্ত ছুটি দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। অনেক সময় শনি বা রবিবার উৎসবের দিন পড়লে, তার বদলে সপ্তাহের অন্য দিন অতিরিক্ত ছুটি দেওয়া হতো।
নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার সেই চেনা ধারা থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসতে চাইছে। নবান্নের একটি সূত্রের মতে, অতিরিক্ত ছুটির সংস্কৃতি বন্ধ করে সরকারি দপ্তরে কাজের পরিবেশ এবং নিয়মিত কর্মদিবস নিশ্চিত করাই এই নতুন সরকারের মূল লক্ষ্য।
কোপ পড়তে পারে দুর্গাপূজার ১৩ দিনের ছুটিতেও!
ঈদের ছুটি কমানোর পর এখন রাজ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তবে কি এবার দুর্গাপূজার ছুটিও কমছে?
গত কয়েক বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপূজা উপলক্ষে দীর্ঘ সরকারি ছুটির রেওয়াজ তৈরি হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে টানা দুই সপ্তাহ সরকারি দপ্তরগুলোতে কাজকর্ম কার্যত স্তব্ধ থাকত। এর ফলে আদালত থেকে শুরু করে সাধারণ প্রশাসনিক পরিষেবা—সব ক্ষেত্রেই স্থবিরতা দেখা দিত।
প্রাসঙ্গিক তথ্য: ক্ষমতা ছাড়ার আগে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবারের দুর্গাপূজায় টানা ১৩ দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছিলেন। এর সঙ্গে ছটপূজা ও ভাইফোঁটা মিলিয়ে আরও বেশ কিছু দিন অতিরিক্ত ছুটি যোগ হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, ঈদের মতো বড় ধর্মীয় উৎসবের অতিরিক্ত ছুটি যখন কমানো হয়েছে, তখন দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটি বহাল রাখা নতুন সরকারের পক্ষে কঠিন হবে। কারণ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিল্পক্ষেত্র বা তথ্যপ্রযুক্তি (IT) সেক্টরে এত দীর্ঘ ছুটি কখনই দেওয়া হয় না।
শিল্প ও বিনিয়োগ ফেরাতে কঠোর অবস্থান
শুভেন্দু সরকারের ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, রাজ্যে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে এবং ঝিমিয়ে পড়া শিল্প পরিস্থিতি চাঙ্গা করতে প্রশাসনিক গতি ও পেশাদার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরি। অতিরিক্ত ছুটি এই উন্নয়নের পথে বড় বাধা।
রাজনৈতিক মহলের মতে, নতুন সরকার জনমোহিনী (Populist) নীতি পরিহার করে কঠোর প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার বার্তা দিতে চাইছে।
তবে এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে বিরোধী শিবির। তাদের অভিযোগ, উৎসবপ্রিয় পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় ও সামাজিক আবেগের জায়গায় অতিরিক্ত কঠোরতা দেখালে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। এই ছুটি ছাঁটাইয়ের রাজনীতি আগামী দিনে রাজ্যের রাজনৈতিক ময়দানকে আরও উত্তপ্ত করবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।