ইরানের ভয়ে ‘অন্ধকারে’ জাহাজ চলাচল

ইরানের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ ও নজরদারি এড়াতে কৌশল পরিবর্তন করেছে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো। 

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার সময় অনেক জাহাজ এখন নিজেদের অবস্থান-নির্ণয় ব্যবস্থা বা অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (AIS) বন্ধ রাখছে। 

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (WSJ)-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

‘গোয়িং ডার্ক’: কী এই নতুন কৌশল?

সামুদ্রিক পরিবহন খাতে জাহাজের অবস্থান গোপন করার এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় “Going Dark” বা “অন্ধকারে যাওয়া”। 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের নৌ টহল বাহিনীর নজরদারি বা সম্ভাব্য কোনো হস্তক্ষেপ থেকে বাঁচতেই এই ঝুঁকি নিচ্ছেন জাহাজ মালিকরা। যদিও এই ব্যবস্থার ফলে মাঝসমুদ্রে অন্য জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি বেড়ে যায়, তবুও ইরান নিয়ন্ত্রিত এই কৌশলগত জলপথে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে একেই শ্রেয় মনে করছেন তারা।

কমেছে জাহাজ চলাচলের সংখ্যা

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের হার নাটকীয়ভাবে কমেছে। যেখানে আগে প্রতিদিন গড়ে ১২৫ থেকে ১৪০টি জাহাজ চলাচল করত, সেখানে বর্তমানে এই সংখ্যা উল্লেখ্যযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া প্রায় ১,৫০০ জাহাজ বর্তমানে পারস্য উপসাগরে অপেক্ষমাণ রয়েছে বলে জানা গেছে।

তথ্য গোপন ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ

সামুদ্রিক তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পোল স্টার গ্লোবাল (Pole Star Global) জানিয়েছে, গত ৫ মার্চ থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করা ৩ হাজার ৩৯৬টি জাহাজের মধ্যে অন্তত ২৩১টি জাহাজ অস্বাভাবিক আচরণ করেছে। 

এসব জাহাজ হয় হঠাৎ ট্র্যাকিং সিস্টেম বন্ধ করে দিচ্ছে, অথবা ভুল অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য প্রচার করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং একটি বৃহৎ পরিসরে সমন্বিত প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ট্র্যাকিং সিস্টেমে বিভ্রান্তি তৈরি করে নিজেদের অবস্থান গোপন রাখা হচ্ছে।

জলপথে ইরানের ‘একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ’

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত বছরের মার্চ থেকে (যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রেক্ষাপটে) ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।

নিষিদ্ধ জাহাজ: যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর চলাচল বর্তমানে এই পথে পুরোপুরি নিষিদ্ধ।

বিধিনিষেধ: জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ন্যাটোভুক্ত কয়েকটি দেশের জাহাজের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন কড়াকড়ি ও অতিরিক্ত মাশুল আরোপ করা হয়েছে।

অনুমতি: শুধুমাত্র নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলা জাহাজগুলোকেই এই পথে যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।

মার্কিন এক সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এই পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, ‘ইরান বাজারের আস্থায় সংকট তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।’

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি প্রকারান্তরে এই সংবেদনশীল জলপথে ইরানের শক্ত অবস্থান ও প্রতিরোধ ক্ষমতারই স্বীকৃতি।