স্বর্ণের মজুদ বাড়াচ্ছে চীন, কারণ কী

নিজেদের সংরক্ষিত তহবিল বা রিজার্ভকে আরও নিরাপদ ও বহুমুখী করতে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন স্বর্ণের প্রতি আগ্রহ বাড়াচ্ছে। এই প্রবণতার অংশ হিসেবে আগামী দিনগুলোতে চীন তাদের স্বর্ণের মজুদের পরিমাণ আরও বাড়াবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল (ডব্লিউজিসি)।

চলতি সপ্তাহে সংস্থাটির সিনিয়র মার্কেট স্ট্র্যাটেজিস্ট ও পাবলিক পলিসি প্রধান জো কাভাতোনি জানান, "আমাদের প্রত্যাশা হলো—চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সেন্ট্রাল ব্যাংকগুলো তাদের কোষাগারে স্বর্ণের মজুদ বৃদ্ধির এই ধারা বজায় রাখবে। তবে সময় ও পরিস্থিতিভেদে এই মজুদ বাড়ানোর গতি বা পরিমাণে কম-বেশি হতে পারে।"

চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক 'পিপলস ব্যাংক অব চায়না'-র তথ্য অনুযায়ী, গত মাস শেষে দেশটির স্বর্ণের মজুদ দাঁড়িয়েছে ৭৪ দশমিক ৬৪ মিলিয়ন ট্রয় আউন্সে (২,৩২২ কেজি), যা গত মার্চের তুলনায় ২ লাখ ৬০ হাজার ট্রয় আউন্স বেশি। এর মাধ্যমে দেশটিতে টানা ১৮ মাসের মতো স্বর্ণের মজুদ বৃদ্ধির রেকর্ড তৈরি হলো।

তুলনামূলকভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের রিজার্ভে বর্তমানে ২৬১ দশমিক ৪৮ মিলিয়ন ট্রয় আউন্স স্বর্ণ রয়েছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি এবং দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক– ফেডারেল রিজার্ভের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাম্প্রতিক প্রান্তিকগুলোতে এই মজুদের পরিমাণ অপরিবর্তিত রয়েছে।

কাভাতোনি উল্লেখ করেন, এই প্রবণতাকে সরাসরি 'ডি-ডলারাইজেশন' বা ডলার বর্জন হিসেবে আখ্যায়িত করা ঠিক হবে না। বরং এটিকে রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে ডলারের বাইরে গিয়ে বৈচিত্র্য আনার একটি সুযোগ হিসেবে করা উচিত, কারণ বিশ্ববাজারে এই মুহূর্তে স্বর্ণের মতো খুব বেশি কার্যকর বা টেকসই বিকল্প নেই।

গত বুধবার কাভাতোনি বলেন, উন্নত অর্থনীতিগুলোতে ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা এবং ফিয়াট কারেন্সির (কাগুজে মুদ্রা) ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত হ্রাস পাওয়ার মতো কিছু কাঠামোগত উদ্বেগের কারণে বিশ্বব্যাপী স্বর্ণের চাহিদা বাড়ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি তুরস্কের কথা উল্লেখ করে বলেন, দেশটি তাদের চলতি হিসাবের ঘাটতি মোকাবিলা করতে এবং নিজস্ব মুদ্রার মান ধরে রাখতে নিজেদের স্বর্ণের মজুদ ব্যবহার করছে।

চলতি বছর বৈশ্বিক গোল্ড এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ)-এর শক্তিশালী চাহিদা বৃদ্ধিতে খুচরা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও বড় ভূমিকা রাখছেন।

বছরের প্রথম চার মাসে বিশ্বব্যাপী গোল্ড ইটিএফ-এ সর্বোচ্চ বিনিয়োগ এসেছে চীন থেকে, যার পরিমাণ প্রায় ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ভারত আকর্ষণ করেছে ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। সুইজারল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্য প্রত্যেকে ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আকর্ষণ করলেও, এই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের পুঁজি বাইরে চলে গেছে।

কাভাতোনি এই প্রবণতার কারণ হিসেবে বলেন, বিশেষ করে যেসব বাজারে আবাসন (রিয়েল এস্টেট) বা অন্যান্য প্রকৃত সম্পদ আশানুরূপ পারফর্ম করছে না, সেখানে স্বর্ণ একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বৈচিত্র্যকরণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। পাশাপাশি চীনের তরুণ বিনিয়োগকারীরা গহনা কেনার চেয়ে গোল্ড ইটিএফ, বার (স্বর্ণের বার বা পিণ্ড) এবং কয়েনের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। মূল ভূখণ্ড চীন এবং হংকংয়ের বিনিয়োগকারীরা এখন স্বর্ণের বাজারে একটি বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে এবং কাউন্সিল এই প্রবণতাটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

স্বর্ণের বিনিয়োগ পণ্যের এই উচ্চ চাহিদার জোয়ারকে কাজে লাগিয়ে এবং হংকংয়ে স্বর্ণের বাণিজ্য পুনরুজ্জীবিত করার আশায় হংকং স্টক এক্সচেঞ্জ গত বৃহস্পতিবার ঘোষণা করেছে যে, তারা গোল্ড ফিউচার কন্ট্রাক্টের ওপর আগামী এক বছরের জন্য ট্রেডিং ফি বা লেনদেন মাশুল মওকুভ করবে এবং বাজারে তারল্য বাড়াতে বিভিন্ন প্রণোদনা কর্মসূচি চালু করবে।

শক্তিশালী মার্কিন ডলার এবং ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার কঠোর আভাস দেওয়া সত্ত্বেও—চীনের বাজারে স্বর্ণের চাহিদা বেশ স্থিতিশীল বা সহনশীল রয়েছে। তবে পশ্চিমা বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণ থেকে কিছুটা দূরে সরে যাচ্ছেন, কারণ উচ্চ সুদের হারের কারণে তাদের কাছে নগদ অর্থ (ডলার) এবং বন্ড বেশি আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠেছে।

চলতি বছর এ পর্যন্ত স্বর্ণের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছে এবং বর্তমানে প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের মূল্য প্রায় ৪,৩৭০ মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যাকে কাভাতোনি "স্থিতিশীল বা শক্ত অবস্থানে থাকা" বলে বর্ণনা করেছেন।

গত বুধবার সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকরক এক নোটে জানিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত সুদ হারের পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে একটি ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। বাজার এখন সুদের হার হ্রাসের প্রত্যাশা থেকে সরে এসে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ড কর্তৃক সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছে, যা স্বর্ণের বাজারের মনোভাবে এক ধরণের নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করছে।

কাভাতোনি বলেন, ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমানোর পক্ষে যাওয়ার জন্য মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমার প্রয়োজন, যাতে স্বর্ণের দামে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখা যায়। কারণ ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ারশ জানিয়েছেন যে, তিনি প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং অবকাঠামো খাতের প্রবৃদ্ধির সুযোগগুলোকে গতিশীল করতে সুদের হার কমাতে চান। সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট