মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর মধ্যে তীব্র ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বিনিময়ের পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে।
গতকাল রোববার পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে একের পর এক হামলা চালিয়েছে তেহরান। একই সঙ্গে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ 'হরমুজ প্রণালি' আবারও বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তারা।
এই নতুন সহিংসতার ফলে গত মাসে স্বাক্ষরিত মার্কিন-ইরান অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর সংশয় দেখা দিয়েছে, যার লক্ষ্য ছিল পরবর্তী ৬০ দিনের আলোচনার মাধ্যমে প্রণালিটি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং যুদ্ধের অবসান ঘটানো।
হরমুজ প্রণালিতে নৌ-যান চলাচলের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ইরান এই হামলা জোরদার করেছে। এবার ইরানের হামলার পরিধি কাতার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে—যা যুদ্ধবিরতি আলোচনার অন্যতম মধ্যস্থতাকারী দেশ এবং গত এপ্রিলের পর সেখানে আর কোনো হামলা হয়নি। এছাড়া, গত মে মাসের পর এই প্রথম সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) জানিয়েছে যে, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরান থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করেছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, বেসামরিক নাবিক ও বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ইরানের আক্রমণ করার সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে রোববার বিকেল ৫টা থেকে তারা ইরানে নতুন করে হামলা শুরু করেছে। সেন্টকমের মুখপাত্র টিম হকিন্স সিএনএন-কে জানান, মার্কিন যুদ্ধবিমান একটি ইরানি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং একটি ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোন ভূপাতিত করেছে। রয়টার্সকে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত টেলিফোন সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সপ্তাহান্তের এই হামলা প্রসঙ্গে বলেন, "আমরা তাদের পিটিয়ে ছাতু করছি (We're beating them up)।"
ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, রোববার হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত সামরিক ঘাঁটি সমৃদ্ধ বন্দর নগরী সিরিক, বন্দর আব্বাস এবং কাছাকাছি কিশম দ্বীপের আশেপাশে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সপ্তাহান্তে মার্কিন "আগ্রাসী" হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। মন্ত্রণালয় আরও জানায়, ওমানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের "প্রকাশ্য ও গোপন" চাপের কারণে হরমুজ প্রণালি ও ট্রানজিট রুট ব্যবস্থাপনা নিয়ে গত শনিবার মাস্কাটে ওমানের সাথে হওয়া আলোচনা কোনো ফলাফলে পৌঁছাতে পারেনি।
এদিকে, ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কলিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন: "একতরফা চুক্তির যুগ শেষ। আমরা আপনাদের বলেছিলাম: কথা রাখুন নতুবা মূল্য দিন। বাস্তবতা এখন দরজায় কড়া নাড়ছে।"
ইরানের নবগঠিত 'পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ' রোববার জানিয়েছে, অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর অবৈধ নড়াচড়ার কারণে বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পারাপার সম্ভব নয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অনুমতিপত্র ইস্যু করা হবে। ইরান গত শনিবার একটি জাহাজে সতর্কতামূলক গুলি ছুড়ে প্রণালি বন্ধের দাবি করে এবং রবিবার দ্বিতীয় আরেকটি জাহাজ অকেজো করার দাবি জানায়। ওমান উপকূলে 'জিএফএস গ্যালাক্সি' নামক একটি কনটেইনার জাহাজে হামলার পর ভারতের এক নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন, তবে ওমান ২৩ জন ক্রুকে উদ্ধার করেছে। কাতার সব ধরনের নৌযানকে তাদের কার্যক্রম স্থগিত করার পরামর্শ দিয়েছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, "ইরান প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করে না, যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।" তবে মার্কিন নৌবাহিনীর নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার ওমানের কাছাকাছি একটি "সম্প্রসারিত" দক্ষিণ রুট ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টকম জানিয়েছে, তারা ইরানের ১৪০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে এবং চলতি সপ্তাহে তিন রাতে ৩০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এর জবাবে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা মার্কিন মিত্র জর্ডানে একটি কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার ও ড্রোন হ্যাঙ্গার ধ্বংস করেছে, কুয়েতে মার্কিন রাডার সাইট ও রকেট লঞ্চার সিস্টেমে আঘাত করেছে, ওমানে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর সহায়তা ও রিফুয়েলিং প্ল্যাটফর্মে হামলা চালিয়েছে এবং কাতারে একটি জেট রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র ও কমান্ড সুবিধা ধ্বংস করেছে।
কাতারে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে একটি শিশুসহ ৩ জন আহত হয়েছে এবং কাতার এর জন্য ইরানকে সম্পূর্ণ দায়ী করেছে। এছাড়া কুয়েতের একটি তেলকূপ খনন প্ল্যাটফর্মে হামলায় এক শ্রমিক আহত হয়েছেন। ওমান তাদের দুটি অঞ্চলে ড্রোন হামলার প্রতিবাদে ইরানি রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে এবং ওমানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস তাদের নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দিয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স