সিএনএনের বিশ্লেষণ

উত্তর কোরিয়ার কোর্টে বল ঠেলে দিলেন ট্রাম্প

দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বড় সামরিক মহড়া কমিয়ে দেওয়ার মার্কিন সিদ্ধান্তে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সুবিধা হওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের নিরাপত্তা ও ওয়াশিংটনের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের মিত্রদের সঙ্গে সামরিক প্রস্তুতি কমানোর এই সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এসেছে, যখন ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বার্ষিক উলচি ফ্রিডম শিল্ড সামরিক মহড়া কমিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ট্রাম্পের দাবি, উত্তর কোরিয়া বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের প্রতি হুমকিমূলক আচরণ করছে না এবং মহড়াগুলো ব্যয়বহুল ও অপ্রয়োজনীয়ভাবে শত্রুতার সংকেত দেয়।

তবে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, ট্রাম্পের এই ব্যাখ্যার সঙ্গে কিম জং উনের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ও পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি আরও জোরদার করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সেনা ও ক্ষেপণাস্ত্র সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি মস্কো ও বেইজিংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাও বাড়িয়েছে পিয়ংইয়ং।

এর মধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়াকে এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের আদর্শ মিত্র হিসেবে তুলে ধরেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। মে মাসে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও ব্যয়কে মিত্রদের জন্য উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

কিন্তু ইরান যুদ্ধের কারণে এশিয়া থেকে মার্কিন সামরিক সম্পদ মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এর আগে কোরীয় উপদ্বীপ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়। সম্প্রতি পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন একমাত্র মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকেও ইরানের কাছাকাছি জলসীমায় পাঠানো হয়েছে।

সামরিক মহড়া কমানোর সিদ্ধান্তের সমর্থকদের যুক্তি, এতে সীমিত মার্কিন সামরিক সম্পদ ও প্রস্তুতি অন্যত্র ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। তবে সমালোচকেরা বলছেন, মহড়া কমালে দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকা প্রায় ৩০ হাজার এবং জাপানে থাকা ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের আরেকটি উদ্বেগ হলো, দীর্ঘদিনের মিত্রদের প্রতি ওয়াশিংটনের নীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তন তাদের আস্থাকে দুর্বল করতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ায় ইতোমধ্যে নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা জোরদার হওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে জাপানও দ্রুত সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।

প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের পেছনে কিম জং উনের সঙ্গে আবারও বৈঠকের আকাঙ্ক্ষা কাজ করতে পারে। অর্থাৎ, সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করতেই ওয়াশিংটন এই পদক্ষেপ নিয়েছে, এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।

তবে সামরিক মহড়া কমানোর এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের কাছে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতির ওপর চাপ, উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতা এবং দক্ষিণ কোরিয়া-জাপানের নিজস্ব প্রতিরক্ষা জোরদারের প্রবণতা, এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তটি এশিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। সূত্র: সিএনএন