নেপালের বন্যায় ভেসে যাওয়া মানুষের মরদেহ নদীর নিচের এলাকাগুলো থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে। হাসপাতালের মর্গে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় মরদেহ সংরক্ষণ ও পরিচয় শনাক্ত করা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে নেপালের কর্তৃপক্ষ।
বন্যায় ভেসে যাওয়া মানুষদের স্বজনেরা প্রিয়জনের খোঁজে ছুটছেন এক জেলা থেকে আরেক জেলায়। কেউ হাতে করে নিয়ে আসছেন নিখোঁজ স্বজনের ছবি, কেউ অপেক্ষা করছেন উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে পরিচিত কোনো মুখের সন্ধানে।
ভোটেকোশী নদীতে সৃষ্ট বন্যায় ভেসে যাওয়া মানুষের মরদেহ রাসুয়া ও নুয়াকোট থেকে শুরু করে অনেক দূরের চিতওয়ান, তানাহুন, নওয়ালপরাসিসহ বিভিন্ন এলাকায় পাওয়া যাচ্ছে। নুয়াকোট, ধাদিং ও নওয়ালপরাসির মর্গে জায়গা না থাকায় কিছু মরদেহ পার্শ্ববর্তী জেলায় পাঠাতে হয়েছে।
সর্বশেষ দুর্যোগে নেপালে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির পুলিশ। উদ্ধার অভিযান চলায় এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
চিতওয়ানে ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীর বিভিন্ন অংশ থেকে মরদেহ উদ্ধার অব্যাহত রয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে নয়টা পর্যন্ত ফিশলিং থেকে গোলাঘাট পর্যন্ত নদীর অংশ থেকে ১৩৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
চিতওয়ানের হাসপাতালগুলোর মর্গে একসঙ্গে মাত্র ৩০ থেকে ৫০টি মরদেহ রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভরতপুরে একটি অস্থায়ী মরদেহ সংরক্ষণকেন্দ্র তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এই কেন্দ্রে প্রায় ২৫০টি মরদেহ রাখার ব্যবস্থা করা হবে।
ভরতপুর মহানগরের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের বিদ্যুৎ সড়কে অবস্থিত শিল্প উদ্যোগ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের একটি অব্যবহৃত ভবনকে এ জন্য ব্যবহার করা হবে। কক্ষের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বসানো হবে এবং মরদেহ দ্রুত পচন ঠেকাতে ব্যবহার করা হবে শুকনো বরফ। এই অস্থায়ী কেন্দ্রেও জায়গা না হলে দেবঘাটের বৈদ্যুতিক শ্মশানকে বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাসুয়া, নুয়াকোট, গোরখাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনেরা চিতওয়ানে আসছেন। ইয়ামান বানু নামের এক নারী একটি তাঁবুর নিচে বসে তার দুই দাদির খবরের অপেক্ষায় ছিলেন। নুয়াকোটের ত্রিশূলী বাজারে থাকা তার দাদি সাকালা ও নানি নাজাবুন নিশা বন্যার পর থেকে নিখোঁজ।
পোখারার পরিস্থিতিও একই রকম। বিভিন্ন জেলা থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহ সেখানে পাঠানো হচ্ছে। তানাহুন, গোরখা, নওয়ালপরাসি পূর্ব ও ধাদিং থেকে মোট ৯৩টি মরদেহ পোখারায় নেওয়া হয়েছে।
কাস্কি জেলার হাসপাতালগুলোতে সব মিলিয়ে ৮৮টি মরদেহ রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু বন্যার মরদেহ আসার আগেই সেখানে পাঁচটি পুরোনো মরদেহ ছিল। ফলে মর্গের ধারণক্ষমতা ইতিমধ্যে ছাড়িয়ে গেছে।
বর্তমানে মরদেহগুলো ২ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এভাবে সাধারণত ১০ দিন থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত মরদেহ সংরক্ষণ করা সম্ভব। এর চেয়ে বেশি সময় রাখতে হলে শূন্যের নিচের তাপমাত্রা বজায় রাখার মতো বিশেষ অবকাঠামো প্রয়োজন, যা পোখারায় নেই।
অসংখ্য মরদেহের পরিচয় এখনো জানা যায়নি। নেপালের প্রচলিত বিধিমালা অনুযায়ী, পুলিশ প্রথমে মরদেহের ছবি তোলে, আঙুলের ছাপ নেয়, ময়নাতদন্ত করে এবং প্রয়োজন হলে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে।
কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছে, বিভিন্ন জেলা থেকে আরও মরদেহ আসতে থাকায় অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের সংখ্যা বাড়বে। তাই এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে এসব মরদেহের ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
ভয়াবহ এই দুর্যোগের কয়েক দিন পরও নদীর তীর ও ভাটির বিভিন্ন এলাকা থেকে মরদেহ উদ্ধারের কাজ চলছে। আর স্বজনেরা অপেক্ষা করছেন-উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে হয়তো মিলবে তাদের হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মানুষটির সন্ধান।