আলজাজিরার বিশ্লেষণ

ইরানের প্রতি সমর্থনে চীনের সীমাবদ্ধতা

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন করে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়ালেও তেহরানের প্রতি চীনের সমর্থনের একটি স্পষ্ট সীমা রয়েছে। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে ইরানকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে বেইজিং কতটা এগোবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।

চীন দীর্ঘদিন ধরে ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দেশটির অর্থনৈতিক সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কিছুটা কমাতে তেহরানকে সহায়তা করেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক চীনের বৃহত্তর পররাষ্ট্রনীতির একটি অংশ মাত্র। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে বেইজিংয়ের।

চীন-মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হংদা ফান বলেন, চীন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত কমাতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে। তবে ইরানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর সম্ভাবনা নেই। তার মতে, শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত দুই দেশকেই নিজেদের মধ্যে সমাধান করতে হবে।

জ্বালানি খাতে চীন ও ইরানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর দেশটির তেল রপ্তানির বড় অংশই চীনের বাজারে গেছে। চলতি সময়ে ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত চীন গ্রহণ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে চীনের সামগ্রিক জ্বালানি চাহিদার তুলনায় ইরানের তেলের অংশ মাত্র প্রায় ২ শতাংশ। ফলে ইরানের তেল চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিকল্প সরবরাহকারীর অভাব নেই। সৌদি আরব, রাশিয়া, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে চীন জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকির কারণে চীনের বড় রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানিগুলোও দীর্ঘদিন ধরে ইরানের তেল কেনা থেকে দূরে রয়েছে। ইরানি তেলের বাণিজ্যে মূলত ছোট স্বাধীন শোধনাগারগুলো যুক্ত, যেগুলোর আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনামূলকভাবে কম সম্পৃক্ততা রয়েছে।

এদিকে ইরানের তেল কেনার সঙ্গে যুক্ত চীন ও হংকংভিত্তিক কিছু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও এখন পর্যন্ত বড় কোনো চীনা ব্যাংককে লক্ষ্যবস্তু করেনি যুক্তরাষ্ট্র। তবে ওয়াশিংটন ইঙ্গিত দিয়েছে, নিষেধাজ্ঞার নতুন অভিযানে চীনের আর্থিক ব্যবস্থাকেও টার্গেট করা হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, চীন এমন পরিস্থিতি এড়াতে চাইবে যাতে ইরানকে সমর্থন করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা এবং দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের সম্ভাব্য বৈঠকের আগে বেইজিংয়ের অবস্থান আরও সতর্ক হতে পারে।

চীন ও ইরানের মধ্যে ২০২১ সালে ২৫ বছরের একটি ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি হয়েছিল। এর আওতায় ইরানে ৪০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে খুব কম প্রকল্পই বাস্তবায়িত হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এবং ইরানের আমলাতান্ত্রিক ও আর্থিক অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

চীনের ইরানি তেল কেনার পরিমাণও সাম্প্রতিক সময়ে কমেছে। হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে মার্চ-এপ্রিল সময়ে প্রতিদিন আনুমানিক ১৮ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হলেও আগস্টে তা কমে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেলে নেমে এসেছে বলে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্যের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

তবে সমুদ্রে থাকা বিপুল পরিমাণ ইরানি তেল এখনো তেহরানের জন্য সম্ভাব্য আয়ের উৎস হিসেবে রয়েছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট দাবি করেছেন, সমুদ্রে ইরানের প্রায় ৩ কোটি ব্যারেল তেল অবশিষ্ট রয়েছে। অন্যদিকে কেপলারের আগের হিসাব অনুযায়ী, সমুদ্রে থাকা তেলের পরিমাণ প্রায় ৮ কোটি ব্যারেল হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের জন্য ইরান গুরুত্বপূর্ণ হলেও অপরিহার্য নয়। ইরান চীনকে ভূরাজনৈতিক সুবিধা এবং সস্তা জ্বালানি সরবরাহ করে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ ধরে রাখাও বেইজিংয়ের জন্য সুবিধাজনক। কিন্তু ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্ক ঝুঁকির মুখে পড়ুক, তা চীন চাইবে না।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় অর্ধেক আসে। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বেইজিংয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের ক্ষেত্রে চীনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি হলো একটি স্থিতিশীল, সার্বভৌম ও অর্থনৈতিকভাবে সংযুক্ত ইরান, তবে এমন ইরান নয়, যার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে চীনকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা উপসাগরীয় দেশগুলোর বিপক্ষে অবস্থান নিতে হয়।

চীন একতরফা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা এবং নিজেদের বৈধ বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় পাল্টা পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিলেও, বিশ্লেষকদের মতে এর অর্থ ইরানের অর্থনীতির পুরো দায়ভার নেওয়া নয়। বরং ইরানের প্রতি বেইজিংয়ের নীতিতে রাজনৈতিক সমর্থনের পাশাপাশি বাণিজ্যিক স্বার্থ ও বৃহত্তর আঞ্চলিক সম্পর্কের হিসাবই প্রাধান্য পাচ্ছে। সূত্র: আলজাজিরা