তাইজে হুথিদের হামলা, আবারও ঘর ছাড়ছেন শত শত পরিবার

ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইজ প্রদেশে হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর তীব্র লড়াইয়ের মধ্যে নতুন করে বাস্তুচ্যুতির ঢেউ শুরু হয়েছে। হুথি বাহিনী কয়েকটি সম্মুখসারিতে অগ্রসর হওয়ার পর নিরাপত্তার জন্য ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন শত শত পরিবার। কয়েক বছর ধরে যুদ্ধের সম্মুখসারি থেকে দূরে থাকা বাস্তুচ্যুত মানুষও এবার নতুন করে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছেন।

তাইজের মাকবানাহ জেলার ৪৭ বছর বয়সী আবদুল্লাহ সাঈদ এমনই একজন। ২০২২ সালে যুদ্ধের কারণে নিজ বাড়ি ছেড়ে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরের জাবাল হাবাশি এলাকার আল-রাহাবাহ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। সেখানে আরও প্রায় ৩০০ পরিবার বসবাস করছিল। মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে নানা সংকট থাকলেও অন্তত যুদ্ধের সম্মুখসারি থেকে দূরে নিরাপদে থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন তারা। কিন্তু সেই নিরাপত্তাও এবার আর থাকল না।

বৃহস্পতিবার ভোরে তাইজের পশ্চিমাঞ্চলে হুথি বাহিনী সরকারি বাহিনীর অবস্থান লক্ষ্য করে নতুন করে অভিযান শুরু করে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর শুরু হয় স্থল লড়াই। জাবাল হাবাশি, মাকবানাহ ও মাওজা এলাকায় সংঘর্ষ দ্রুত তীব্র হয়ে ওঠে।

হুথি যোদ্ধারা আল-রাহাবাহর দিকে অগ্রসর হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সাঈদসহ শিবিরের শত শত পরিবার আবারও পালিয়ে যায়।

আল জাজিরাকে সাঈদ বলেন, রাতে হঠাৎ করে লড়াই শুরু হয়। তারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরে থাকলেও সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখতে পান, সম্মুখসারি তাদের শিবিরের কাছাকাছি চলে এসেছে। ফলে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র নিয়ে দ্রুত পালানো ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ ছিল না।

২০২২ সালে গোলাগুলির মধ্যে আটকে পড়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা থাকায় এবার আর ঝুঁকি নিতে চাননি সাঈদ। তিনি বলেন, যুদ্ধ শিবিরে পৌঁছানোর আগেই তারা সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

তবে শুধু আল-রাহাবাহ শিবিরের মানুষই নন, আশপাশের অন্যান্য শিবির ও গ্রাম থেকেও বহু পরিবার পালিয়ে গেছে। সাঈদের ভাষায়, কেউ দ্বিতীয়বার, আবার কেউ প্রথমবারের মতো বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তাদের এখন জরুরি ভিত্তিতে আশ্রয় ও মৌলিক সেবার প্রয়োজন।

নতুন করে পালিয়ে বর্তমানে অন্য একটি বাস্তুচ্যুত শিবিরে আত্মীয়দের সঙ্গে অবস্থান করছেন সাঈদ। কয়েক বছর ধরে তিনি আশা করেছিলেন, একদিন হয়তো মাকবানাহর নিজের বাড়িতে ফিরতে পারবেন। কিন্তু তাইজে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ায় সেই প্রত্যাশাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এখন তার চাওয়া, অন্তত আল-রাহাবাহ শিবিরে ফিরে গিয়ে আশ্রয়, পানি ও পরিচিত পরিবেশটুকু ফিরে পাওয়া।

তাইজে এবারের সংঘর্ষকে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর সবচেয়ে বড় সামরিক উত্তেজনাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। হুথিরা মাকবানাহ, মাওজা ও জাবাল হাবাশি এলাকায় অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সরকারি বাহিনী কয়েকটি অবস্থান পুনর্দখলের দাবি করেছে। উভয় পক্ষই নতুন করে যোদ্ধা ও সামরিক যান এনে সম্মুখসারি শক্তিশালী করছে।

এই লড়াইয়ের কৌশলগত গুরুত্বও রয়েছে। তাইজ শহর থেকে লোহিত সাগরের উপকূলীয় আল-মাখা বন্দরের সঙ্গে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি এই সংঘাতের কাছাকাছি। হুথিরা সড়কটি বিচ্ছিন্ন করতে পারলে সরকারি বাহিনীর জন্য উপকূলীয় অঞ্চলের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ সংকুচিত হতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

ইয়েমেনে ২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখলের পর থেকে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত চলছে। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর কয়েক বছর তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি থাকলেও চলতি আগস্ট থেকে বিভিন্ন এলাকায় আবারও হামলা ও পাল্টা হামলা বেড়েছে। জাতিসংঘও সতর্ক করেছে, ইয়েমেন আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

এদিকে তাইজে নতুন করে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়েছেন বেসামরিক মানুষ ও আগে থেকেই বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো। একবার ঘর হারিয়ে আশ্রয় নেওয়া এসব মানুষের আবারও পালিয়ে বেড়ানো শুধু নিরাপত্তা সংকট নয়, খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের সংকটকেও আরও গভীর করতে পারে।

সাঈদের মতো বহু বাস্তুচ্যুত মানুষের কাছে এখন যুদ্ধের কোনো পক্ষের বিজয় নয়—প্রয়োজন শুধু নিরাপদে বেঁচে থাকা এবং স্থিতিশীল একটি আশ্রয়ে ফিরে যাওয়া।