বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট এভারেস্টের পাদদেশে অবস্থিত খুম্বু হিমবাহ শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই ঝুঁকিতে নেই; সেখানে মানুষের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিও হিমবাহটির ওপর স্থানীয়ভাবে বাড়তি চাপ তৈরি করছে। নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে জ্বালানি পোড়ানো থেকে শুরু করে মানুষের মূত্রত্যাগ পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মকাণ্ড হিমবাহের পরিবেশে উষ্ণতা ও দূষণ বাড়াচ্ছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে Regional Environmental Change জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাটিতে এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের পরিবেশের ওপর মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণার জন্য ২০২৩ সালের বসন্তকালীন পর্বতারোহণ মৌসুমের মাঠপর্যায়ের তথ্য এবং ১৯৯১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণের তথ্য ব্যবহার করা হয়।
গবেষকদের মতে, এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে মানুষের কর্মকাণ্ড থেকে পরিবেশের ওপর প্রধানত তিন ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে—বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন, স্থানীয়ভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার এবং মানুষের মূত্রত্যাগ।
জ্বালানি ও মানুষের বর্জ্যেও বাড়ছে তাপ
এভারেস্ট বেস ক্যাম্প সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫ হাজার ৩৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। বসন্তের পর্বতারোহণ মৌসুমে সেখানে কয়েক সপ্তাহ ধরে হাজারো পর্বতারোহী, গাইড, শেরপা, গবেষক ও সহায়ক কর্মী অবস্থান করেন। ফলে বরফের ওপর সাময়িকভাবে গড়ে ওঠে একটি ব্যস্ত জনবসতির মতো পরিবেশ।
গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৩ সালের বসন্ত মৌসুমে এলপিজি, কেরোসিন ও পেট্রোল ব্যবহারের পাশাপাশি মানুষের মূত্রত্যাগ থেকে মোট প্রায় ৮ লাখ ৪৯ হাজার মেগাজুল তাপশক্তি উৎপন্ন হয়েছিল। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এই পরিমাণ শক্তি তাত্ত্বিকভাবে প্রায় ২ হাজার ৪৯২ টন বরফ ও তুষার গলানোর সমপরিমাণ। তবে গবেষকেরা এটিকে সরাসরি ২ হাজার ৪৯২ টন বরফ গলে যাওয়ার পরিমাণ হিসেবে দেখাননি; এটি ওই মানব কর্মকাণ্ড থেকে উৎপন্ন তাপের সম্ভাব্য প্রভাব বোঝানোর একটি হিসাব।
গবেষণায় মানুষের মূত্রত্যাগের বিষয়টিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উচ্চতায় অবস্থানকারী পর্বতারোহী ও কর্মীরা প্রচুর পানি পান করেন এবং ফলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মূত্র উৎপন্ন হয়। সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে গবেষণাটির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, বেস ক্যাম্পে প্রতিদিন আনুমানিক ৬ হাজার লিটার মূত্র উৎপন্ন হতে পারে।
স্থানীয় উষ্ণতা বাড়ছে দ্রুত
স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণ করেও গবেষকেরা এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের পরিবেশে উদ্বেগজনক পরিবর্তনের চিত্র পেয়েছেন। ১৯৯১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত Landsat স্যাটেলাইটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বেস ক্যাম্প এলাকায় ভূমির পৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রতি বছর গড়ে প্রায় ০.২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস করে বেড়েছে। গবেষকদের হিসাবে, এটি খুম্বু হিমবাহের বেস ক্যাম্পসংলগ্ন অংশের উষ্ণতা বৃদ্ধির হারের প্রায় দ্বিগুণ।
তবে এর অর্থ এই নয় যে মানুষের কর্মকাণ্ডই খুম্বু হিমবাহ গলার প্রধান কারণ। গবেষণাটি বরং দেখিয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নই বড় প্রেক্ষাপট তৈরি করছে, আর বেস ক্যাম্পে মানুষের ঘন উপস্থিতি তার ওপর স্থানীয় বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের হিমবাহগুলো দীর্ঘমেয়াদে যে সংকটে পড়ছে, স্থানীয় মানব কর্মকাণ্ড সেই সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
দূষণের আরেক নাম পর্যটন
এভারেস্টে মানুষের উপস্থিতি গত কয়েক দশকে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। পর্বতারোহণ ও পর্যটন স্থানীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর পরিবেশগত মূল্যও রয়েছে। গবেষণায় খুম্বু অঞ্চলে মানুষের বর্জ্য, জ্বালানি ব্যবহার এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ডের পরিবেশগত প্রভাবের কথা উঠে এসেছে। এর আগের গবেষণাগুলোতেও এভারেস্ট অঞ্চলের তুষার ও বরফে মানুষের কর্মকাণ্ড থেকে আসা প্লাস্টিক, রাসায়নিক পদার্থ, ধাতু ও অন্যান্য দূষকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।
এ কারণে প্রশ্ন উঠছে—বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্বতারোহণ কেন্দ্রগুলোর একটি এভারেস্ট বেস ক্যাম্পকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রাখা যাবে?
গবেষকদের মতে, সমাধানের একটি অংশ হতে পারে স্থানীয় পর্যায়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো, মানববর্জ্য ও মূত্রের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত পরিবেশগত পর্যবেক্ষণ। একই সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবিলায় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো ছাড়া খুম্বু হিমবাহকে দীর্ঘমেয়াদে রক্ষা করা সম্ভব নয়।
প্রয়োজনে সরাতে হতে পারে বেস ক্যাম্প
গবেষণাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বর্তমান এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলা। বর্তমান ক্যাম্পটি সরাসরি হিমবাহের ওপর অবস্থিত হওয়ায় বরফের পরিবর্তনের সঙ্গে এর স্থিতিশীলতাও বদলাচ্ছে।
গবেষকেরা সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে বর্তমান বেস ক্যাম্পের দক্ষিণ-পশ্চিমে দুটি তুলনামূলক স্থিতিশীল স্থান চিহ্নিত করেছেন। ভবিষ্যতে বর্তমান অবস্থানটি অনিরাপদ হয়ে পড়লে এসব স্থানে বেস ক্যাম্প স্থানান্তরের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
এভারেস্ট শুধু একটি পর্বত নয়; এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক প্রতীক। কিন্তু বিশ্বের ছাদে মানুষের উপস্থিতি যত বাড়ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—প্রকৃতিকে জয় করার চেয়ে তাকে রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
খুম্বু হিমবাহকে বাঁচাতে তাই শুধু পর্বতারোহীদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নয়, জ্বালানি ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি ও স্যানিটেশন এবং দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। এভারেস্ট বেস ক্যাম্পকে টেকসই করতে হলে মানুষের পদচিহ্ন যতটা সম্ভব হালকা করাই হতে পারে সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ।
'ডিসেম্বরে নেত্রী আইতাছে', বলেই জামায়াত নেতার ওপর হামলা
ইয়েমেনে হুথি-সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষে নিহত ৮১
নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পুকুরে পর্যটকবাহী ডাবল ডেকার বাস