বিশ্বের বিভিন্ন মহাদেশের প্রকৃত আয়তন তুলনামূলকভাবে সঠিকভাবে তুলে ধরতে ‘ইকুয়াল আর্থ’ (Equal Earth) মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহিত করার একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ভোটাভুটিতে প্রস্তাবটির পক্ষে ১৬৪টি দেশ ভোট দেয়। যুক্তরাষ্ট্র বিপক্ষে ভোট দেয় এবং সার্বিয়া, এস্তোনিয়া, জর্জিয়া, লিথুয়ানিয়া, মলদোভা ও ইউক্রেন ভোটদানে বিরত থাকে।
আফ্রিকার দেশ টোগোর নেতৃত্বে এবং আফ্রিকান ইউনিয়নের সমর্থনে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত ‘মার্কেটর’ মানচিত্রের পরিবর্তে এমন একটি মানচিত্রের প্রচলন করা, যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থলভাগের আপেক্ষিক আয়তন আরও সঠিকভাবে ফুটে ওঠে।
১৬ শতকে তৈরি মার্কেটর প্রজেকশনে বিষুবরেখা থেকে দূরের অঞ্চলগুলো বাস্তবের তুলনায় অনেক বড় দেখায়। ফলে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মতো উত্তরাঞ্চলীয় ভূখণ্ডের আয়তন অতিরঞ্জিত হয় এবং আফ্রিকা তুলনামূলকভাবে ছোট দেখায়।
এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ গ্রিনল্যান্ড ও আফ্রিকা। প্রচলিত মার্কেটর মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে আফ্রিকার কাছাকাছি আয়তনের মনে হতে পারে। বাস্তবে আফ্রিকার আয়তন গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ১৪ গুণ। ইকুয়াল আর্থ মানচিত্রে এই পার্থক্য অনেক বেশি বাস্তবসম্মতভাবে ফুটে ওঠে।
‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রজেকশনটি ২০১৮ সালে কার্টোগ্রাফার বোয়ান শাভরিচ, বার্নহার্ড জেনি ও টম প্যাটারসন তৈরি করেন। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের আয়তনের পারস্পরিক অনুপাত বজায় রাখা।
টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট দুসেই এই উদ্যোগকে ন্যায্য ও বাস্তবভিত্তিক ভূচিত্র উপস্থাপনের প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। টোগোর নেতৃত্বে পরিচালিত ‘করেক্ট দ্য ম্যাপ’ প্রচারণার যুক্তি হলো, মানচিত্র শুধু ভৌগোলিক তথ্য দেয় না; এটি পৃথিবী সম্পর্কে মানুষের ধারণাকেও প্রভাবিত করে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত বিকৃত মানচিত্র আফ্রিকার গুরুত্ব ও আয়তন সম্পর্কে মানুষের ধারণায় প্রভাব ফেলেছে বলে তাদের দাবি।
জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্বের স্কুল, সরকারি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ইকুয়াল আর্থ বা অনুরূপ সমান-আয়তনভিত্তিক মানচিত্র ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে পারে। তবে সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। অর্থাৎ দেশগুলোকে মার্কেটর মানচিত্র পুরোপুরি পরিত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়নি।
এ সিদ্ধান্তে মার্কেটর প্রজেকশনের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। বিশেষ করে নৌ ও বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে দিকনির্দেশনা ও নেভিগেশনের জন্য মার্কেটর প্রজেকশন এখনো কার্যকর। নতুন প্রস্তাবটি মূলত শিক্ষা, সাধারণ বিশ্ব মানচিত্র, প্রতিষ্ঠান ও জনসাধারণের ব্যবহারে আরও বাস্তবসম্মত ভূচিত্র তুলে ধরার ওপর জোর দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছে। মার্কিন প্রতিনিধি এটিকে প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রয়োজনীয় উদ্যোগ হিসেবে দেখেছেন এবং ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এর পেছনে একটি ‘আদর্শিক’ অবস্থান কাজ করছে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে উদ্যোগটির সমর্থকেরা বলছেন, পৃথিবীর ভূখণ্ডকে বাস্তব আয়তনে উপস্থাপন করা শুধু কার্টোগ্রাফির বিষয় নয়; এটি বিশ্ব সম্পর্কে মানুষের দীর্ঘদিনের ধারণা সংশোধনেরও একটি উপায়। বিশেষ করে আফ্রিকার ক্ষেত্রে মহাদেশটির বিশাল ভৌগোলিক আয়তন ও বৈশ্বিক গুরুত্বকে আরও যথাযথভাবে তুলে ধরাই এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
ফলে জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্তকে তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ব মানচিত্র বদলে যাওয়ার ঘটনা না হলেও, বিশ্বের ভৌগোলিক উপস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।