ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব অবৈধ বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড। একই সঙ্গে ইসরায়েলি অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ বন্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। ব্রিটিশ সরকারের ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের অংশ হিসেবে মিলিব্যান্ড এ অবস্থান তুলে ধরেছেন। তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্য ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য ও কিছু সেবা আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা করছে।
মিলিব্যান্ডের অবস্থানের কেন্দ্রে রয়েছে ২০২৪ সালের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) পরামর্শমূলক মতামত। ওই মতামতে আদালত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অব্যাহত উপস্থিতিকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করে এবং অন্য রাষ্ট্রগুলোকে এই পরিস্থিতি টিকিয়ে রাখতে সহায়তা না করার বিষয়ে দায়িত্বের কথা বলে।
যুক্তরাজ্যের নতুন নীতির আওতায় অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলো থেকে পণ্য আমদানির পাশাপাশি কিছু সেবা, অর্থায়ন ও বিজ্ঞাপন কার্যক্রমের ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে। ব্রিটিশ সরকারের মতে, এর লক্ষ্য অবৈধ বসতি সম্প্রসারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে সহায়তা কমানো। বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে পশ্চিম তীরের E1 এলাকা। সেখানে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ হলে পশ্চিম তীর কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়তে পারে বলে ফিলিস্তিনি ও আন্তর্জাতিক মহলে আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ভৌগোলিক ধারাবাহিকতা ও দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মিলিব্যান্ডের পদক্ষেপকে যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিনের নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এত দিন লন্ডন দুই-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে অবস্থান জানালেও ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে বাস্তব পদক্ষেপের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সতর্ক ছিল। নতুন নীতিতে সেই অবস্থান বদলানোর ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। মিলিব্যান্ডের বক্তব্যে ইসরায়েল ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইসরায়েল এর আগে গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দেওয়ার বিষয়ে মিলিব্যান্ডের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তার অবস্থানকে একপেশে বলে সমালোচনা করেছে।
অন্যদিকে ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠনগুলো বলছে, শুধু বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়। তাদের দাবি, ২০২৪ সালের আইসিজে মতামত বাস্তবায়নে যুক্তরাজ্যকে আরও ব্যাপক পদক্ষেপ নিতে হবে। জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেস্কা আলবানিজও বলেছেন, অধিকৃত ভূখণ্ডে ইসরায়েলের উপস্থিতিকে অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করা আইসিজের মতামতের পূর্ণ বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
লন্ডনের এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন পরীক্ষা তৈরি করতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম সম্প্রতি ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে দুই-রাষ্ট্র সমাধান নিয়ে আলোচনা করেছেন। একই সময়ে ওয়াশিংটনকে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনার বিষয়েও অবহিত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা মনে করছেন, বসতি-কেন্দ্রিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মূলত সীমিত থাকবে এবং এতে যুক্তরাজ্য-ইসরায়েলের বৃহত্তর বাণিজ্য বা নিরাপত্তা সম্পর্ক পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
মিলিব্যান্ডের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- যুক্তরাজ্য এখন ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণকে শুধু রাজনৈতিক বিরোধের বিষয় হিসেবে নয়, আন্তর্জাতিক আইন ও ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার প্রশ্ন হিসেবেও দেখছে। পশ্চিম তীরে নতুন বসতি, ভূমি দখল ও বসতি স্থাপন অব্যাহত থাকলে একটি স্বাধীন ও ভৌগোলিকভাবে সংযুক্ত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠতে পারে। আর সেই কারণেই ব্রিটেনের নতুন অবস্থানকে শুধু ইসরায়েলবিরোধী কূটনৈতিক বক্তব্য হিসেবে নয়, দীর্ঘদিন ধরে ঘোষিত দুই-রাষ্ট্র সমাধান রক্ষার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।