তিন বছরে ১,৩৭০ চিকিৎসক হারিয়েছে ইসরায়েল

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:২৪ পিএম

গত তিন বছরে অন্তত ১ হাজার ৩৭০ চিকিৎসক ইসরায়েল ছেড়ে গেছেন। তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকদের আশঙ্কা, অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দেশত্যাগ দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থায় জনবল সংকট আরও তীব্র করতে পারে।

২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চিকিৎসকদের বিদেশযাত্রার তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি করা হয়েছে। গবেষকদের হিসাবে, কোনো চিকিৎসক বিদেশে যাওয়ার পর প্রথম বছরে ২৭০ দিনের বেশি সেখানে থাকলে এবং পরবর্তী সময়ে টানা তিন মাসের বেশি ইসরায়েলে না ফিরলে তাকে দেশত্যাগী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

গবেষণার অন্যতম লেখক অধ্যাপক ইতাই আতার বলেন, ২০২৩ সাল থেকেই ইসরায়েল থেকে দক্ষ পেশাজীবীদের দেশত্যাগ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সরকারের বিচারব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতি এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

চিকিৎসকদের দেশত্যাগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ, তাদের একটি বড় অংশ অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশ ছেড়ে যাওয়া চিকিৎসকদের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের বয়স ৪৫ বছরের বেশি। তাদের অনেকেই বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

বিশেষায়িত চিকিৎসাক্ষেত্রেও এর প্রভাব স্পষ্ট। গবেষণায় দেখা গেছে, চক্ষু, চর্ম ও নাক-কান-গলা (ইএনটি) বিভাগের ১১৬ জন চিকিৎসক ইসরায়েল ছেড়েছেন, যা এসব বিভাগের মোট চিকিৎসকের প্রায় ৬ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময়ে প্রায় ১৮৮ জন সার্জন দেশ ছেড়েছেন, যা এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মোট সংখ্যার প্রায় ৬ শতাংশ।

অঞ্চলভেদেও পার্থক্য রয়েছে। চিকিৎসকদের দেশত্যাগের হার সবচেয়ে বেশি তেল আবিব এলাকায় প্রায় ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।

এদিকে ইসরায়েলের অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক বছরে সরকারি হাসপাতালের প্রায় ২৪ শতাংশ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অবসরের বয়সে পৌঁছাবেন। আরও প্রায় ২৫ শতাংশ ইতোমধ্যে অবসরের বয়স অতিক্রম করলেও চিকিৎসক সংকটের কারণে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

অধ্যাপক আতার বলেন, বর্তমান সংখ্যার চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো দেশত্যাগের ধারাবাহিকতা। আগামী ২৭ অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচনের পর এই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

শুধু চিকিৎসকরাই নন, সামগ্রিকভাবেও ইসরায়েল থেকে মানুষের দেশত্যাগ বাড়ছে। তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ২ লাখ ৬৮ হাজার ৫০৯ জন ইসরায়েলি অন্তত তিন মাসের জন্য দেশ ছেড়েছেন। ইসরায়েলি সম্প্রচারমাধ্যম কান এই সংখ্যাকে রেকর্ড হিসেবে উল্লেখ করেছে।

যুদ্ধ, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় এবং বিচারব্যবস্থা সংস্কারকে ঘিরে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংকটকে দেশত্যাগের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বিভিন্ন ইসরায়েলি প্রতিবেদনে। আগস্টে কান-এর জন্য পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, প্রায় প্রতি পাঁচজন ইসরায়েলির একজন গত দুই বছরে দেশ ছাড়ার কথা বিবেচনা করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, চিকিৎসকদের দেশত্যাগ কেবল জনবল সংকটের বিষয় নয়; এটি ইসরায়েলের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কমে গেলে রোগীদের চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি নতুন চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ ও বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থায়ও চাপ বাড়বে।

যুদ্ধ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপের মধ্যে চিকিৎসকদের এই ‘ব্রেন ড্রেইন’ অব্যাহত থাকলে ইসরায়েলের স্বাস্থ্যখাতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

সূত্র: আল জাজিরা

এম সি এইচ
আরও পড়ুন