যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানালো ইরানের সাবেক দুই প্রেসিডেন্ট, তীব্র বিতর্ক

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের অবসান এবং কূটনীতির পথে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের সাবেক দুই প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ও মোহাম্মদ খাতামি।

যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে তারা ‘সম্মানজনক’ সমাধানের কথা বললেও, রুহানি এ বিতর্কে জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানোয় দেশটির কট্টরপন্থীদের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েছেন।

সাবেক প্রেসিডেন্ট রুহানি সম্প্রতি সাবেক কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে বলেন, ইরান যদি আরও ২০ বছর বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যেতে চায়, তাহলে জনগণের মতামতও জানতে হবে। জনগণ যদি এই পথকে সমর্থন করে, তাহলে তা অব্যাহত রাখা যেতে পারে। কিন্তু জনগণ যদি অন্য কোনো পথ বেছে নিতে চায়, সেই মতামতও গ্রহণ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রুহানির এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিভাজন তৈরি হয়েছে। কট্টরপন্থীদের বক্তব্য, দেশ যখন সামরিক হামলার মুখে রয়েছে, তখন যুদ্ধ ও জাতীয় প্রতিরক্ষার মতো বিষয়কে সাধারণ মানুষের মতামতের ওপর নির্ভরশীল করা যায় না।

কট্টরপন্থী সংবাদপত্র কায়হানের সম্পাদক হোসেইন শারিয়াতমাদারি মঙ্গলবার রুহানি ও খাতামির সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, দুই সাবেক প্রেসিডেন্ট বাস্তব পরিস্থিতিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করছেন। যুদ্ধের সময় তাদের এমন অবস্থানকে তিনি ‘অসম্মানজনক ও অপমানজনক আত্মসমর্পণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তার মতে, এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এমন সুবিধা পেতে পারে, যা তারা দুই দফা যুদ্ধের মাধ্যমেও অর্জন করতে পারেনি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কিছু সময়ের আপেক্ষিক স্থিতাবস্থার পর আবারও সামরিক হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হয়েছে। একই সময়ে কূটনৈতিক উদ্যোগও স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতেই যুদ্ধ বন্ধের আহ্বানকে ঘিরে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও একাধিকবার যুদ্ধের অবসানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তার বক্তব্য, ইরান যেন ‘ক্ষমতা ও মর্যাদা’ বজায় রেখেই সংঘাতের অবসান ঘটায়। মূল্যস্ফীতি, নিষেধাজ্ঞা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় ধরনের পতনের মতো অর্থনৈতিক চাপের কারণে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।

তবে রুহানির বক্তব্য বিতর্ককে আরও সংবেদনশীল সাংবিধানিক প্রশ্নের দিকে নিয়ে গেছে। তিনি সরাসরি গণভোটের দাবি না জানালেও, বড় জাতীয় সিদ্ধান্তে জনগণের মতামত নেওয়ার পুরোনো বিতর্কটি আবার সামনে এসেছে।

ইরানের সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা গণভোট ও জনগণের সরাসরি মতামতের মাধ্যমে প্রয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে এই বিধানের আওতায় এখন পর্যন্ত কোনো গণভোট অনুষ্ঠিত হয়নি।

২০২৩ সালে তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিরোধ মেটাতে গণভোট আয়োজনের দাবির বিরোধিতা করেছিলেন। তার যুক্তি ছিল, জটিল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় বিশ্লেষণের জন্য সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা নাও থাকতে পারে ।বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেই পুরোনো বিতর্কই নতুন মাত্রা পেয়েছে।

সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাইয়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত তাবনাক রুহানির বক্তব্যের বিরোধিতা করে প্রশ্নটির ধরন নিয়েই আপত্তি তুলেছে। তাদের বক্তব্য, গণভোট হলে প্রশ্নটি হতে হবে স্পষ্ট—বিদেশি হামলার বিরুদ্ধে দেশ রক্ষায় জনগণ কি সমর্থন করে, নাকি তারা দেশকে আত্মসমর্পণের অনুমতি দিতে চায়? তাদের মতে, প্রশ্নের ভাষার এই পার্থক্য রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও শব্দের কারসাজির মধ্যকার পার্থক্য তুলে ধরে।

রেভল্যুশনারি গার্ড বা আইআরজিসির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাসনিম নিউজও রুহানির সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, রুহানি যে রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন, তারা আলোচনা, শান্তি ও যুদ্ধের মতো জটিল বিষয়কে অতিরিক্ত সরল করে দেখছেন। কয়েকটি আইনি ধারা ও দুটি স্বাক্ষরের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের কয়েক দশকের বিরোধ মিটে যাবে—এমন ধারণাকে তারা সরলতা ও বাস্তবতাবিবর্জিত চিন্তা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

কায়হানও যুদ্ধের সময় গণভোটের প্রস্তাবকে ইরানের অবস্থান দুর্বল করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে। তাদের ভাষ্য, দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রশ্নকে দলীয় বা রাজনৈতিক বিভাজনের বিষয়ে পরিণত করা জাতীয় দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার শামিল এবং এটি শত্রুর চাপ সৃষ্টির কৌশলকে সহায়তা করতে পারে।

মিডিয়ার বাইরে সরাসরি রাজনৈতিক সমাবেশেও রুহানির বিরুদ্ধে বক্তব্য এসেছে। একটি রাতের জনসমাবেশে বক্তাদের একজন দাবি করেন, দেশ পরিচালনায় সর্বোচ্চ নেতা ও সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান থাকায় রুহানির এ বিষয়ে আলাদা অবস্থান নেওয়ার অধিকার নেই।

কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতা ও বক্তা মেহদি সালাহশোরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে রুহানির বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন। যুদ্ধ চলবে কি না, তা জনগণের কাছে জানতে চাওয়া হলে জাতীয় ঐক্য ও মনোবল দুর্বল হবে এবং যুদ্ধক্ষেত্র ও রাস্তায় থাকা যোদ্ধাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তবে রুহানি ও খাতামির অবস্থান সর্বত্র প্রত্যাখ্যাত হয়নি। রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যম খবর অনলাইন বলেছে, সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ছাড়া জীবিত অন্য সাবেক প্রেসিডেন্টরা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলছেন। তাদের ভাষ্য, খাতামি ‘সম্মানজনক শান্তি’ এবং রুহানি ‘মর্যাদাপূর্ণ সমাপ্তি’র কথা বলছেন।

মধ্যপন্থী ওয়েবসাইট রুয়দাদ২৪ও দুই সাবেক প্রেসিডেন্টের অবস্থানকে গুরুত্ব দিয়েছে। তাদের মতে, পেজেশকিয়ানের সরকারের ভেতরে থাকা সংস্কারপন্থীদের তুলনামূলক নীরবতার বিপরীতে রুহানি এমন একটি অবস্থান সামনে এনেছেন, যা অনেক ইরানি নাগরিক তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছ থেকে শুনতে চেয়েছিলেন।

ইরানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ আলী সোবহানিও খাতামির অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। কাতার, জর্ডান ও লেবাননে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করা সোবহানির মতে, সংঘাতকে অনির্দিষ্টকাল ঝুলিয়ে রাখা সম্ভব নয়। পরিস্থিতি বদলে আলোচনার পরিবেশ তৈরি এবং সমঝোতার পথে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন, যাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন পাওয়া যায়।

ফলে যুদ্ধের মাঠের সংঘাতের পাশাপাশি ইরানের ভেতরেও এখন লড়াই চলছে দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক ধারণার মধ্যে—একদিকে প্রতিরোধ ও সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার পক্ষ, অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপ কমিয়ে কূটনীতির মাধ্যমে ‘মর্যাদাপূর্ণ’ সমাধানের চেষ্টা। রুহানি ও খাতামির সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই বিতর্ককে আরও প্রকাশ্য ও তীব্র করে তুলেছে।