আয়ারল্যান্ডে স্থানের নামে টিকে আছে হারিয়ে যাওয়া প্রাণীদের স্মৃতি

আজকের আয়ারল্যান্ডে অনেক বন্যপ্রাণী হয়তো আর চোখে পড়ে না। তবে দ্বীপটির পাহাড়, উপত্যকা, নদী ও জনপদের নামের মধ্যে এখনও টিকে আছে হারিয়ে যাওয়া প্রাণীদের স্মৃতি। ঈগল, নেকড়ে কিংবা সারসের মতো প্রাণীর অস্তিত্বের ইঙ্গিত বহনকারী এসব পুরোনো নাম নতুন করে আগ্রহ তৈরি করছে প্রকৃতিপ্রেমী ও পরিবেশবিদদের মধ্যে।

আয়ারল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে আটলান্টিকের ঝড়-তাণ্ডবে ক্ষয়প্রাপ্ত অসংখ্য দুর্গম পাহাড় ও উপকূলীয় ভূখণ্ড। ইউরোপের প্রায় শেষ প্রান্তে অবস্থিত কাউন্টি কেরির ডিঙ্গল উপদ্বীপ দেখতে কালো পাথর ও সবুজ ঘাসে গড়া বাঁকানো আঙুলের মতো। সেই উপদ্বীপের একেবারে শেষ প্রান্তে সমুদ্রের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে একটি পাহাড় স্লিভ অ্যান আইওলার। আইরিশ ভাষায় যার অর্থ ‘ঈগলের পাহাড়’।

এই পাহাড়ের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হারিয়ে যাওয়া এক বন্যপ্রাণীর স্মৃতি। বিখ্যাত আইরিশ লোককথা সংগ্রাহক ও লেখক পেইগ সেয়ার্স তাঁর শৈশবের স্মৃতিচারণায় জানিয়েছিলেন, তাঁর ছোটবেলায় পাহাড়টি ঈগলে ভরা থাকত। পরে সেখানে আর কোনো ঈগল দেখা যায়নি।

পেইগ সেয়ার্স ১৮৭৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৫৮ সালে মারা যান। তাঁর জীবদ্দশাতেই আয়ারল্যান্ড থেকে দুটি প্রজাতির ঈগল বিলুপ্ত হয়ে যায় পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারী সোনালি ঈগল, আইরিশ ভাষায় ‘আইওলার ফিরিয়ান’, এবং সাদা-লেজের ঈগল বা ‘আইওলার মারা’।

সেয়ার্সের স্মৃতিতে, পাহাড়ের ওপর একটি হ্রদের পাশের খাড়া পাথুরে ঢালে একসময় ঈগলের বাসা দেখা যেত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই বাসা এবং ঈগল দুটিই হারিয়ে যায়। তাঁর ছেলে পরবর্তীতে মায়ের স্মৃতিচারণ লিখে রাখেন। সেখানে সেয়ার্সের বক্তব্য ছিল, ওই পাহাড়ে ঈগলের বাসা থাকার দিন অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।

তবে ঈগল হারিয়ে গেলেও তার নাম রয়ে গেছে ভূখণ্ডের পরিচয়ে।

আয়ারল্যান্ডজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য প্রাচীন আইরিশ স্থাননাম। এসব নাম কেবল কোনো এলাকার পরিচয় নয়; অনেক ক্ষেত্রে এগুলো সেই অঞ্চলের অতীত প্রকৃতি, প্রাণী, উদ্ভিদ, ভূমির আকৃতি, কৃষিকাজ এমনকি আবহাওয়া ও জলবায়ুরও বর্ণনা বহন করে।

কোনো এলাকার নামের সঙ্গে যদি নির্দিষ্ট কোনো প্রাণীর উল্লেখ থাকে, তাহলে সেটি সেখানে একসময় ওই প্রাণীর উপস্থিতির সম্ভাব্য ইঙ্গিত দিতে পারে। একইভাবে কোনো স্থাননামে জলাভূমি, বন, নদী বা তৃণভূমির উল্লেখ থাকলে তা অতীতের ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।

এ কারণেই আয়ারল্যান্ডের পুরোনো স্থাননাম নিয়ে গবেষণায় নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। গবেষকেরা মনে করছেন, এসব নামের ভেতরে লুকিয়ে থাকা তথ্য ব্যবহার করে দ্বীপটির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের অতীত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া সম্ভব।

কোনো কোনো স্থাননাম হয়তো এমন প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের স্মৃতি ধরে রেখেছে, যা বর্তমান ভূদৃশ্যে আর স্পষ্টভাবে দেখা যায় না। কোথাও হয়তো একসময় বিস্তৃত জলাভূমি ছিল, কোথাও ছিল বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। সময়ের সঙ্গে মানুষের বসতি, কৃষিকাজ ও ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তনে সেই পরিবেশ হারিয়ে গেলেও স্থানটির পুরোনো নামটি থেকে গেছে।

ফলে ভাষা এখানে শুধু সংস্কৃতির বাহক নয়, হয়ে উঠতে পারে পরিবেশের ইতিহাস সংরক্ষণের একটি অপ্রত্যাশিত দলিল।

প্রকৃতিবিদ ও পরিবেশবিদদের কাছে এই তথ্যের গুরুত্ব আরও বেশি। অতীতে কোনো অঞ্চলে কোন প্রাণী বা উদ্ভিদ ছিল, কোথায় জলাভূমি কিংবা প্রাকৃতিক আবাসস্থল ছিল এসব ধারণা বর্তমান পরিবেশ সংরক্ষণেও কাজে লাগতে পারে।

অর্থাৎ একটি পুরোনো পাহাড়ের নাম হয়তো শুধু অতীতের গল্প বলে না; সেটি ভবিষ্যতের সংরক্ষণ পরিকল্পনার জন্যও সূত্র দিতে পারে।

‘ঈগলের পাহাড়’-এর মতো নাম তাই আয়ারল্যান্ডের হারিয়ে যাওয়া বন্যপ্রকৃতির এক ধরনের জীবন্ত স্মৃতিচিহ্ন। ঈগল নেই, কিন্তু নামটি রয়ে গেছে। আর সেই নামের ভেতর দিয়ে শত বছর আগের একটি পৃথিবী যেখানে পাহাড়ের আকাশে ঈগল উড়ত, ভূমিতে নানা বন্যপ্রাণী বিচরণ করত আজও যেন মানুষের কাছে ফিরে আসে।

গবেষকদের কাছে এই পুরোনো নামগুলো তাই কেবল ভাষাগত ঐতিহ্য নয়; এগুলো আয়ারল্যান্ডের হারিয়ে যাওয়া পরিবেশের মানচিত্রও হতে পারে।