দিল্লির রাস্তায় পুতিনের বুলেটপ্রুফ ‘অরাস সেনাট’, কী আছে এই গাড়িতে

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৮ এএম

১৮তম ব্রিকস (BRICS) সম্মেলনে যোগ দিতে নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে এসেছে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থায় সজ্জিত বিশাল বহর। এর মধ্যে রয়েছে পুতিনের বিশেষভাবে প্রস্তুত করা প্রেসিডেন্টিয়াল বিমান, যেটিকে প্রায়ই ‘ফ্লাইং ক্রেমলিন’ বলা হয়। তবে দিল্লির রাস্তায় সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে তাঁর সুরক্ষিত বিলাসবহুল গাড়ি—অরাস সেনাট (Aurus Senat)।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা বিদেশ সফরে নিজেদের বিশেষ বিমান ব্যবহার করেন, সেটি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু পুতিনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি আরও কঠোর। তাই বিদেশ সফরেও তিনি নিজের জন্য নির্দিষ্ট গাড়ি সঙ্গে নিয়ে যান। অরাস সেনাট শুধু একটি বিলাসবহুল লিমুজিন নয়; এটি বিশ্বের সবচেয়ে গোপনীয় ও সুরক্ষিত রাষ্ট্রীয় গাড়িগুলোর একটি।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের প্রায় ২৫ বছরের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে তৈরি হয়েছে বহু রাজনৈতিক ও সামরিক বিরোধিতা। ফলে তাঁর চলাচলের নিরাপত্তায় ব্যবহৃত গাড়িটিও সাধারণ প্রেসিডেন্টিয়াল গাড়ির তুলনায় অনেক বেশি সুরক্ষিত করে তৈরি করা হয়েছে।

অরাস সেনাট নিয়ে আগেও ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। গত বছর চীনে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (SCO) সম্মেলনের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে পুতিনের এই গাড়িতে তাঁর সঙ্গে বসে ভ্রমণ করতে দেখা যায়। সেই ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বেশ সাড়া ফেলেছিল।

চাকার ওপর যেন দুর্গ

পুতিনের নিরাপত্তা বহরে সাধারণত প্রায় দুই ডজন গাড়ি থাকে। তবে বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যানগুলোর একটি হলো বুলেটপ্রুফ ও বিস্ফোরণ-প্রতিরোধী অরাস সেনাট। নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে গাড়িটিকে অনেক সময় ‘ফোর্ট্রেস অন হুইলস’ বা ‘চাকার ওপর দুর্গ’ বলা হয়।

এটি পূর্ণ আকারের বিলাসবহুল লিমুজিন। রাশিয়ার অরাস মোটরস এই গাড়ি তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান NAMI, Sollers JSC এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের Tawazun Holding।

২০১৮ সালে অরাস সেনাট প্রথম সামনে আসে। এটি রাশিয়ার ‘কর্তেজ’ (Kortezh) প্রকল্পের অংশ। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য দেশীয়ভাবে বিলাসবহুল ও সাঁজোয়া গাড়ি তৈরি করা।

গাড়িটির নকশায় সাবেক সোভিয়েত যুগের বিখ্যাত ZIS-110 লিমুজিনের নকশার প্রভাব রয়েছে। তবে আধুনিক সেনাটে যুক্ত করা হয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ সুরক্ষা।

শক্তিশালী ইঞ্জিন, বিশাল আকৃতি

পুতিনের অরাস সেনাটে রয়েছে ৪.৪ লিটারের টুইন-টার্বোচার্জড V8 ইঞ্জিন, যার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে একটি হাইব্রিড সিস্টেম। গাড়িটি প্রায় ৫৯৮ হর্সপাওয়ার শক্তি এবং সর্বোচ্চ ৮৮০ নিউটন-মিটার টর্ক উৎপন্ন করতে পারে।

এর সঙ্গে রয়েছে ৯-স্পিড স্বয়ংক্রিয় গিয়ারবক্স।

গাড়িটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৫ হাজার ৬৩০ মিলিমিটার, প্রস্থ ২ হাজার মিলিমিটার এবং উচ্চতা ১ হাজার ৭০০ মিলিমিটার। হুইলবেস প্রায় ৩ হাজার ৩০০ মিলিমিটার।

এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ১৬০ কিলোমিটার। শূন্য থেকে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার গতিতে পৌঁছাতে সময় লাগে আনুমানিক ৯ সেকেন্ড।

তবে পুতিনের ব্যবহৃত সংস্করণটি সাধারণ অরাস সেনাটের চেয়ে অনেক বেশি সুরক্ষিত বলে মনে করা হয়। এর প্রকৃত বর্মের পুরুত্ব, সুরক্ষা প্রযুক্তি ও বিশেষ প্রতিরোধব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয় না।

শুধু গুলি নয়, বিস্ফোরণ থেকেও সুরক্ষা

গাড়িটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর নিরাপত্তাব্যবস্থা। পুতিনের ব্যবহৃত অরাস সেনাট ভারী বর্মে সুরক্ষিত এবং গুলি ও বিস্ফোরণের মতো বিভিন্ন ধরনের হুমকি মোকাবিলার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত।

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বহরের প্রয়োজন অনুযায়ী এতে উন্নত ব্রেকিং সিস্টেম, ইলেকট্রনিক ট্র্যাকশন কন্ট্রোল, অ্যাডাপটিভ ক্রুজ কন্ট্রোল এবং লেন ডিপার্চার ওয়ার্নিংয়ের মতো আধুনিক প্রযুক্তি রয়েছে।

গাড়িটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে কঠিন পরিস্থিতিতেও প্রেসিডেন্টকে দ্রুত ও নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া যায়। এর প্রকৃত প্রতিরক্ষা সক্ষমতার বড় একটি অংশ অবশ্যই গোপন রাখা হয়।

ভেতরে বিলাসিতার ছোঁয়া

বাইরে থেকে অরাস সেনাটকে যতটা শক্তিশালী ও সুরক্ষিত মনে হয়, ভেতরের পরিবেশ তার সম্পূর্ণ বিপরীত—অত্যন্ত বিলাসবহুল।

গাড়ির অভ্যন্তরে ব্যবহার করা হয়েছে উন্নতমানের চামড়া, কাঠের অলংকরণ এবং আধুনিক ইনফোটেইনমেন্ট প্রযুক্তি। প্রেসিডেন্টের দীর্ঘ সময় গাড়িতে অবস্থানের কথা বিবেচনা করে অভ্যন্তরীণ আরাম ও প্রযুক্তিগত সুবিধার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

গাড়িটি তীব্র ঠান্ডা থেকে শুরু করে কঠিন আবহাওয়ার বিভিন্ন পরিস্থিতিতে চলাচলের উপযোগী করেও তৈরি করা হয়েছে।

কেন বিদেশ সফরেও গাড়ি সঙ্গে নেন পুতিন?

রাষ্ট্রপ্রধানদের নিরাপত্তায় ব্যবহৃত গাড়ি শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়। এটি পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিদেশ সফরে স্থানীয়ভাবে সরবরাহ করা গাড়ির বদলে নিজের নিরাপত্তা-মান অনুযায়ী প্রস্তুত করা গাড়ি ব্যবহার করলে নিরাপত্তা প্রটোকল নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।

পুতিনের মতো উচ্চ-ঝুঁকির নিরাপত্তা প্রোফাইলের রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিশেষ বিমান, নিরাপত্তা সদস্য এবং অন্যান্য সহায়ক যানবাহনের সঙ্গে অরাস সেনাটও তাঁর বিদেশ সফরের নিরাপত্তা বহরের একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে।

নয়াদিল্লির রাস্তায় তাই পুতিনের এই গাড়ির উপস্থিতি শুধু বিলাসবহুল গাড়ির প্রদর্শন নয়; এটি রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থারও একটি দৃশ্যমান প্রতীক।

এমএজেড
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত