হুথিদের নতুন অগ্রযাত্রা কী শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে?

ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল ধরে হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রা দেশটির যুদ্ধের কৌশলগত সমীকরণ বদলে দিয়েছে। মোখা দখলের পর হুথি বাহিনী ধুবাবের দিকে অগ্রসর হয়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশে অবস্থিত মায়ুন বা পেরিম দ্বীপ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এসব এলাকা শুধু ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়; বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের ওপরও এর প্রভাব রয়েছে।

তবে এই অগ্রযাত্রাকে শুধু ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধের আরেকটি অধ্যায় হিসেবে দেখলে পুরো পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের পুরোনো সংঘাত এবং ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের সমীকরণ।

একসঙ্গে কয়েকটি যুদ্ধের ছায়া

ইয়েমেনে হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। প্রথমত, দেশটির শক্তির ভারসাম্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে ধারণা তৈরি হয়েছিল, বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়ে ভিন্ন হতে পারে। দ্বিতীয়ত, সামরিক সাফল্য ব্যবহার করে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক আলোচনায় নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে চায় হুথিরা।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধের প্রভাব। মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাত ইয়েমেনকেও নতুন করে সামরিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

হুথিদের জন্য লোহিত সাগরের উপকূল ও বাব আল-মান্দেবের আশপাশের অঞ্চল নিয়ন্ত্রণের অর্থ শুধু ভূখণ্ড দখল নয়। এটি তাদের হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত চাপ তৈরির সুযোগও এনে দেয়। কারণ, বাব আল-মান্দেব দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে এবং এটি সুয়েজ খালমুখী সামুদ্রিক যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ।

কিন্তু অগ্রযাত্রা কি টেকসই হবে?

এখানেই বড় প্রশ্ন। দ্রুত সামরিক অগ্রগতি সবসময় দীর্ঘমেয়াদি বিজয়ের নিশ্চয়তা দেয় না। হুথিরা যদি নতুন দখল করা এলাকাগুলো ধরে রাখতে চায়, তাদের সামনে সামরিক প্রতিরোধের পাশাপাশি প্রশাসন, সরবরাহ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমর্থন ধরে রাখার চ্যালেঞ্জও থাকবে।

অন্যদিকে সৌদি আরব ও তাদের মিত্ররা হুথিদের এই অগ্রযাত্রাকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখতে পারে। ফলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

হুথিদের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুবিধা হতে পারে—তারা সামরিক সাফল্যকে আলোচনার টেবিলে রাজনৈতিক প্রভাব হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। কিন্তু একই কৌশল উল্টো ফলও দিতে পারে। অতিরিক্ত অগ্রযাত্রা আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে তাদের বিরুদ্ধে আরও ঐক্যবদ্ধ করতে পারে।

বাব আল-মান্দেব কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এই অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ফলে হুথিদের সামরিক উপস্থিতি যতই এই জলপথের কাছাকাছি যায়, ততই তাদের হাতে কৌশলগত চাপ তৈরির সম্ভাবনা বাড়ে। বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা, বিমা ব্যয়, পরিবহন সময় এবং জ্বালানি বাজার—সবকিছুর ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।

তবে এখানেও ঝুঁকি রয়েছে। আন্তর্জাতিক নৌপথে দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করলে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

ইরান-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন ক্ষেত্র

ইয়েমেন বহু বছর ধরে ইরান ও সৌদি আরবের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। হুথিদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সংঘাতের আন্তর্জাতিক মাত্রাও বেড়েছে।

তবে হুথিদের প্রতিটি পদক্ষেপকে কেবল ইরানের নির্দেশ বা প্রক্সি যুদ্ধ হিসেবে ব্যাখ্যা করাও যথেষ্ট নয়। ইয়েমেনের নিজস্ব রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক বাস্তবতা রয়েছে। হুথিদের স্থানীয় লক্ষ্য, ক্ষমতা ধরে রাখার প্রয়োজন এবং ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোয় নিজেদের অবস্থান—এসব বিষয়ও তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

কোথায় হতে পারে ব্যর্থতা?

হুথিদের সাম্প্রতিক সাফল্য যতটা দৃশ্যমান, তা ধরে রাখা ততটাই কঠিন হতে পারে। তিনটি জায়গায় তাদের বড় পরীক্ষা দিতে হবে।

প্রথমত, ভূখণ্ড ধরে রাখা। দ্রুত দখল করা এলাকা দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে স্থায়ী সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামো প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া। হুথিদের অগ্রযাত্রা যদি সৌদি আরব, উপসাগরীয় দেশ এবং অন্যান্য শক্তিকে নতুন করে সামরিকভাবে সক্রিয় করে, তাহলে সংঘাতের চাপ বহুগুণ বাড়তে পারে।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সমাধান। সামরিক বিজয়কে রাজনৈতিক সমঝোতায় রূপান্তর করতে না পারলে নতুন করে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফাঁদে পড়তে পারে হুথিরা।

ইয়েমেনে হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা নিঃসন্দেহে তাদের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়িয়েছে। মোখা থেকে ধুবাব এবং মায়ুন দ্বীপের দিকে অগ্রসর হওয়া তাদের লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব ঘিরে প্রভাব বিস্তারের আকাঙ্ক্ষাকে স্পষ্ট করেছে।

কিন্তু যুদ্ধের মাঠে দ্রুত অগ্রগতি আর স্থায়ী বিজয় এক বিষয় নয়। হুথিরা যদি সামরিক সাফল্যকে রাজনৈতিক দর-কষাকষির শক্তিতে পরিণত করতে পারে, তাহলে এই অভিযান তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে। আর যদি অতিরিক্ত বিস্তার তাদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর সামরিক জোট তৈরি করে, তাহলে এই অগ্রযাত্রাই শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

অর্থাৎ, হুথিদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আর কতটা এগোতে পারবে—তা নয়; বরং যতটা এগিয়েছে, সেটি কতটা ধরে রাখতে পারবে।