ধানখেতে তখন থইথই পানি। বাতাসে দুলছে ধানের চারা। মাঠের বুকজুড়ে ছোট মাছের ছুটোছুটি। কিন্তু পানি যখন ধীরে ধীরে কমে আসে, তখনও জমির এক কোণে থেকে যায় একটুখানি পানি। সেখানে ডালপালার নিচে, কাদার ভেতর লুকিয়ে থাকে পুঁটি, টেংরা, কৈ, শিং কিংবা মাগুর।
জমির এক কোণে একটু গভীর করে রাখা সেই জায়গাটিই ছিল ‘মাছের আধার’। বড় কোনো পুকুর নয়, মাছের খামারও নয়। জমির সামান্য একটু জায়গা গভীর করে তৈরি করা ছোট্ট একটি আশ্রয়। সেখানে ডালপালা, খড়কুটো কিংবা লতাপাতা ফেলে রাখা হতো। বর্ষার পানি কিংবা সেচের পানি মাঠে ছড়িয়ে পড়লে মাছও চলে আসত সেখানে। পানি কমে গেলেও আধারের গভীরে কিছু পানি থেকে যেত।
বছরে দুবার সেচ দেওয়ার সময় সেই আধার থেকেই মিলত দেশীয় মাছের প্রাচুর্য।
একসময় গ্রামবাংলার কৃষিজীবনে এটি ছিল খুবই পরিচিত দৃশ্য। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে জমির কোণে মাছের আধার, আর তার সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে কৃষকের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এক অনন্য লোকজ জ্ঞান।
‘মাছের আধার’ শুনতে যতটা সাধারণ, এর পেছনের বুদ্ধিটা ছিল ততটাই চমৎকার।
জমির অন্য অংশের তুলনায় এক কোণ একটু গভীর করে দেওয়া হতো। এমনভাবে, যাতে সারা জমির পানি শুকিয়ে গেলেও সেখানে পানি কিছুটা বেশি সময় থাকে। তারপর সেই জায়গায় ফেলে রাখা হতো ডালপালা, খড়কুটো, লতাপাতা কিংবা ছোট গাছের অংশ।
সেগুলো শুধু মাছ ধরার ফাঁদ ছিল না; মাছের জন্য তৈরি করত নিরাপদ আশ্রয়।
বর্ষায় আশপাশের খাল, বিল কিংবা নিচু জমি থেকে মাছ ধানখেতে ঢুকত। সাঁতার কেটে তারা চলে যেত সেই গভীর জায়গাটিতে। ডালপালার নিচে লুকিয়ে থাকত। কখনো শিকারির হাত থেকে বাঁচতে, কখনো রোদ থেকে আশ্রয় নিতে, কখনো বা নিরাপদে থাকতে।
জমির পানি কমে এলে মাছের সেই আশ্রয়স্থলই হয়ে উঠত কৃষকের ছোট্ট মাছের ভাণ্ডার।
বছরে দুবার সেচ, দুবার মাছ
কৃষকেরা জানতেন কখন সেই আধার থেকে মাছ তোলা যাবে।
বছরে দুবার সেচ দেওয়ার সময় জমির পানি কমে আসত। চারপাশের পানি যখন শুকিয়ে যেত, তখন জমির এক কোণে থাকা আধারটিতে পানি ও মাছ কিছুটা জমে থাকত। সেখান থেকেই ধরা হতো নানা জাতের দেশীয় মাছ।
কখনো জাল দিয়ে, কখনো ঝাঁকি দিয়ে, কখনো হাত দিয়েই মাছ তুলে আনতেন কৃষকেরা।
ধরা পড়ত পুঁটি, টেংরা, কৈ, শিং, মাগুর, শোল, গজারসহ নানা জাতের মাছ। অঞ্চলভেদে মাছের ধরনও বদলে যেত।
কয়েক কেজি মাছ হয়তো আজকের বাজারদরে খুব বড় কোনো সম্পদ নয়। কিন্তু একসময় একটি কৃষক পরিবারের জন্য সেটিই ছিল বাজার না করে পাওয়া বাড়তি খাবার।
ধানের জমি থেকে ধান, সেই একই জমির পানি থেকে মাছ—এক জমিতেই যেন দুই রকম ফসল।
মাছের খাবার দিতে হতো না, প্রকৃতিই করত সব
মাছের আধারের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক ছিল—এখানে মাছ পালনের জন্য আলাদা করে খুব বেশি কিছু করতে হতো না।
কোনো কৃত্রিম খাবার নেই। কোনো বিশেষ ওষুধ নেই। বড় কোনো অবকাঠামো নেই।
জমির কোণে কিছু ডালপালা, কিছু পানি আর প্রকৃতির ওপর ভরসা—এই ছিল মূল ব্যবস্থা।
পানিতে পড়ে থাকা পাতা ও উদ্ভিদের অংশ ধীরে ধীরে পচে জৈব উপাদান তৈরি করত। সেখানে জন্ম নিত নানা ধরনের ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী ও পোকামাকড়। সেগুলো আবার মাছের খাবারে পরিণত হতো।
অর্থাৎ কৃষক না জেনেই তৈরি করে ফেলতেন একটি ছোট্ট জলজ বাস্তুতন্ত্র।
প্রকৃতির সঙ্গে এমন সহাবস্থানই ছিল গ্রামবাংলার কৃষির সৌন্দর্য।
তখন জমি শুধু জমি ছিল না
আজকের দিনে কৃষিজমিকে আমরা মূলত ফসল উৎপাদনের জায়গা হিসেবেই দেখি। কিন্তু আগের দিনের কৃষকের কাছে জমি ছিল তার চেয়েও বেশি কিছু।
একই জমি ধান দিত, মাছ দিত, শাক দিত। জমির পাশে থাকা ডোবা দিত পানি, খাল দিত মাছ, গাছ দিত ফল ও জ্বালানি।
প্রকৃতির প্রতিটি অংশের সঙ্গে কৃষকের ছিল এক ধরনের সম্পর্ক।
‘মাছের আধার’ সেই সম্পর্কেরই একটি ছোট্ট উদাহরণ।
কৃষক জমির একটি অংশকে মাছের জন্য ছেড়ে দিতেন। বিনিময়ে প্রকৃতি তাকে দিত খাবার।
হারিয়ে গেল কেন?
সময়ের সঙ্গে কৃষি বদলে গেছে। বদলে গেছে গ্রামের জলাভূমিও।
একসময় গ্রামের খাল, বিল, ডোবা ও নিচু জমির সঙ্গে ধানক্ষেতের ছিল সরাসরি যোগাযোগ। বর্ষা এলেই পানি ছড়িয়ে পড়ত। সেই পানির সঙ্গে মাছও ছড়িয়ে পড়ত মাঠে।
এখন অনেক খাল ভরাট। অনেক ডোবা হারিয়ে গেছে। নিচু জমি হয়ে গেছে বসতবাড়ি কিংবা অন্য স্থাপনা। কোথাও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে।
কৃষিজমিতেও এসেছে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা। পানি জমে থাকলে অনেক কৃষক দ্রুত তা বের করে দেন, যাতে ফসলের ক্ষতি না হয়।
ফলে মাছের জন্য আর সেই পুরোনো আশ্রয় তৈরি হয় না।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার। অতিরিক্ত রাসায়নিকের প্রভাবে জলজ পরিবেশের ওপরও পড়ছে চাপ।
আর উচ্চফলনশীল জাত ও নিবিড় কৃষির যুগে জমির প্রতিটি ইঞ্চি ব্যবহারের প্রবণতায় ‘মাছের জন্য একটু জায়গা’ রাখার সংস্কৃতিও ক্রমে হারিয়ে গেছে।
এক সময় জমির কোণে করা সেই ছোট্ট গর্ত একসময় একটি পরিবারের মাছের ভাণ্ডার হয়ে উঠত। ‘মাছের আধার’ তাই শুধু মাছ ধরার একটি কৌশল ছিল না—এটি ছিল প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থানের এক সহজ, বুদ্ধিদীপ্ত ও স্বদেশি পদ্ধতি।
সেই আধার হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় মাছের আশ্রয়, জলজ জীববৈচিত্র্য এবং কৃষকের প্রজন্মান্তরের মূল্যবান জ্ঞান।
আধুনিক কৃষি আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। এখন সময় এসেছে পুরোনো সেই জ্ঞান থেকেও কিছু শেখার।
যাতে জমি শুধু ধান না দেয়—জমির এক কোণে আবার পানি জমে, মাছ আসে, আর ফিরে আসে গ্রামবাংলার সেই হারিয়ে যাওয়া স্বাদ।
আসিফ নজরুলকে গ্রেপ্তারের দাবি নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর
ডায়ালাইসিস সেবা নিয়ে সরকারের বড় উদ্যোগ
কুষ্টিয়ায় জমি নিয়ে বিরোধে ভাইয়ের হাতে ভাই খুন
সর্বনাশা মোবাইল অ্যাপ!