বিশ্বের জ্বালানি বাজার যখন এমনিতেই তীব্র অনিশ্চয়তার মধ্যে, তখন সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। হামলার পর নিরাপত্তার স্বার্থে পাইপলাইনটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে রিয়াদ। এর প্রভাব শুধু সৌদি আরবের তেল পরিবহন ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়; বৈশ্বিক তেল সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাজারের দাম এবং এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তাতেও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।
১ হাজার ২০০ কিলোমিটারের ‘বিকল্প পথ’
সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন দেশটির পূর্বাঞ্চলের প্রধান তেলক্ষেত্রগুলোকে পশ্চিম উপকূলের ইয়ানবু বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা সম্ভব।
এর সবচেয়ে বড় কৌশলগত গুরুত্ব হলো—এই পাইপলাইন সৌদি আরবকে হরমুজ প্রণালির বিকল্প রুট দেয়।
পারস্য উপসাগরের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য হরমুজ বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক জ্বালানি করিডরগুলোর একটি। সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্র থেকে সরাসরি সমুদ্রপথে তেল রপ্তানি করতে হলে হরমুজের ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়। কিন্তু পূর্ব থেকে পশ্চিমে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল ইয়ানবু বন্দরে পৌঁছে দিলে হরমুজ এড়িয়ে লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানি করা যায়।
অর্থাৎ, হরমুজ যখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন এই পাইপলাইন সৌদি আরবের জন্য শুধু একটি তেল পরিবহন ব্যবস্থা নয়—এটি একটি কৌশলগত ব্যাকআপ রুট।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পাইপলাইনটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। একই সময়ে ইয়েমেনের হুথি বাহিনীর হামলার কারণে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে একই সময়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর চাপের মুখে।
একদিকে হরমুজে সামুদ্রিক পরিবহন বাধাগ্রস্ত, অন্যদিকে লোহিত সাগর অঞ্চলেও নিরাপত্তা ঝুঁকি। এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ছিল তেল সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ।
সেই পথও যদি সাময়িকভাবে অচল হয়ে যায়, তাহলে বৈশ্বিক বাজারে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে।
সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনকে অনেকটা বৈশ্বিক তেল ব্যবস্থার একটি ‘বিকল্প শ্বাসনালী’ বলা যায়। হরমুজে সমস্যা হলে এই পাইপলাইন দিয়ে সৌদি তেল পশ্চিম উপকূলে নিয়ে গিয়ে বিশ্ববাজারে পাঠানো সম্ভব। কিন্তু সেই বিকল্প পথও যখন হামলার কারণে বন্ধ হয়ে যায়, তখন সংকটের গভীরতা বেড়ে যায়।
বিশ্বের তেল বাজার এখন এমন এক পর্যায়ে রয়েছে যেখানে একটি পাইপলাইন বন্ধ হওয়া শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত সমস্যা নয়। এটি হয়ে উঠতে পারে আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তা, তেলের দাম, মুদ্রাস্ফীতি এবং আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকির সংকেত।
আর যদি হরমুজ, বাব আল-মান্দাব এবং সৌদি আরবের বিকল্প তেল রুট—তিনটিই একই সময়ে বাধাগ্রস্ত থাকে, তাহলে প্রশ্নটা আর শুধু ‘তেলের দাম কত বাড়বে’-এ সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং প্রশ্ন হবে—বিশ্বের তেল সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা চাপ সহ্য করতে পারবে।