শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের পারফরম্যান্স দেখার কেউ নেই

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪০ পিএম

প্রাথমিক শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে বছরজুড়েই নানা ধরনের প্রশিক্ষণের আয়োজন করে সরকার। বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ, পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন, পাঠদান পদ্ধতি, মূল্যায়ন কৌশলসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এসব প্রশিক্ষণের পেছনে প্রতিবছর সরকারি অর্থও ব্যয় হচ্ছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে।

কিন্তু বড় প্রশ্নটি রয়ে গেছে—প্রশিক্ষণে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে বাস্তবে কতটা প্রয়োগ করছেন, সেটি মূল্যায়ন করেন কে?

প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর একজন শিক্ষক আগের তুলনায় কতটা দক্ষ হয়েছেন, পাঠদানের পদ্ধতিতে কী পরিবর্তন এনেছেন, শিক্ষার্থীদের বোঝানোর কৌশল কতটা উন্নত হয়েছে কিংবা প্রশিক্ষণে শেখানো আধুনিক পদ্ধতিগুলো নিয়মিত ক্লাসে ব্যবহার করছেন কি না—এসব বিষয়ে নিয়মিত ও কাঠামোবদ্ধ মূল্যায়নের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ফলে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বিপুল অর্থ ব্যয়ে প্রশিক্ষণ আয়োজন করা হলেও প্রশিক্ষণের বাস্তব ফলাফল কতটা শ্রেণিকক্ষে পৌঁছাচ্ছে, সেটি অনেক ক্ষেত্রেই অনিশ্চিত থেকে যাচ্ছে।

প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপজেলা রিসোর্স সেন্টার বা ইউআরসি (URC) পর্যায়ে কর্মকর্তারা থাকেন। তাদের অন্যতম কাজ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত থাকা।

প্রশিক্ষণের আয়োজন, প্রশিক্ষণার্থীদের অংশগ্রহণ, সময়সূচি, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনা—এসব কার্যক্রম তদারকিতে ইউআরসি কর্মকর্তাদের ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু প্রশিক্ষণ শেষে শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে গিয়ে সেই জ্ঞান কতটা প্রয়োগ করছেন, সেটি নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য পর্যাপ্ত জনবল ও কার্যকর ব্যবস্থা আছে কি না—এ প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

অর্থাৎ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু প্রশিক্ষণের ফলাফল পরিমাপ করা হচ্ছে কি না—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

একজন শিক্ষক প্রশিক্ষণে যে পদ্ধতি শিখলেন, কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর তিনি সেটি ক্লাসে ব্যবহার করছেন কি না, শিক্ষার্থীরা তার সুফল পাচ্ছে কি না—এ ধরনের তথ্য ছাড়া প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা নির্ণয় করাও কঠিন।

উপজেলা পর্যায়ে ইউআরসি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থাকলেও শ্রেণিকক্ষে প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান বাস্তবায়নের বিষয়টি পর্যবেক্ষণে তাদের ভূমিকা কতটা—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ধরা যাক, একজন শিক্ষককে গণিত পড়ানোর নতুন কৌশল শেখানো হলো। প্রশিক্ষণে তাকে বলা হলো, শুধু বইয়ের লেখা মুখস্থ করানো নয়; বরং শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিষয়টি বোঝাতে হবে। কিন্তু প্রশিক্ষণ শেষে ওই শিক্ষক বাস্তবে কীভাবে গণিত পড়াচ্ছেন, শিক্ষার্থীরা কতটা বুঝছে কিংবা প্রশিক্ষণে শেখানো কৌশল তিনি ব্যবহার করছেন কি না—এসব বিষয় যদি কেউ পর্যবেক্ষণ না করেন, তাহলে প্রশিক্ষণের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল নিশ্চিত করা কঠিন।

একইভাবে বাংলা, ইংরেজি, বিজ্ঞান কিংবা অন্যান্য বিষয়ের প্রশিক্ষণেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য।

উপজেলা শিক্ষা অফিস প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকির গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তর। বিদ্যালয়ে শিক্ষক উপস্থিত আছেন কি না, বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম ঠিকভাবে চলছে কি না—এসব বিষয় সাধারণত পরিদর্শন ও মনিটরিংয়ের আওতায় আসে।

কিন্তু একটি উপজেলার বিপুলসংখ্যক বিদ্যালয়ের তুলনায় উপজেলা শিক্ষা অফিসে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সংখ্যা সীমিত। ফলে প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিয়মিত গিয়ে শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ, শিক্ষকের পাঠদান পদ্ধতি যাচাই এবং শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি মূল্যায়ন করা বাস্তবে কঠিন হয়ে পড়ে।

এ কারণে শিক্ষক সময়মতো বিদ্যালয়ে উপস্থিত হচ্ছেন কি না—এটি যাচাই করা গেলেও তিনি শ্রেণিকক্ষে গিয়ে কী পড়াচ্ছেন এবং কীভাবে পড়াচ্ছেন—সেটি একই মাত্রায় নিশ্চিত করা যাচ্ছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।

প্রাথমিক শিক্ষার মান নির্ধারণে শুধু শিক্ষক বিদ্যালয়ে উপস্থিত আছেন কি না, সেটিই একমাত্র সূচক হতে পারে না।

একজন শিক্ষক নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকতে পারেন, সময়মতো ক্লাসেও যেতে পারেন। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে তার পাঠদান কতটা কার্যকর, শিক্ষার্থীরা বিষয়টি বুঝছে কি না, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে কি না, প্রশ্ন করার সুযোগ পাচ্ছে কি না কিংবা নতুন শিক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ও শিক্ষার মানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

অর্থাৎ ‘শিক্ষক উপস্থিত’ এবং ‘মানসম্মত পাঠদান হচ্ছে’—দুটি এক বিষয় নয়।

শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হলে উপস্থিতি মনিটরিংয়ের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষভিত্তিক একাডেমিক মনিটরিং জোরদার করা প্রয়োজন।

প্রশিক্ষণের জন্য প্রশিক্ষক, প্রশিক্ষণ উপকরণ, ভেন্যু, যাতায়াত, ভাতা ও অন্যান্য খাতে সরকারি অর্থ ব্যয় হয়। বছরের বিভিন্ন সময়ে বিষয়ভিত্তিক ও পেশাগত প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়।

ফলে প্রশিক্ষণকে শুধু একটি প্রশাসনিক কার্যক্রম হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি সরকারি বিনিয়োগ। আর যেকোনো বিনিয়োগের মতো প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও জানতে হবে—বিনিয়োগের বিপরীতে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে কি না।

একজন শিক্ষক প্রশিক্ষণ নিলেন—এটাই প্রশিক্ষণের সাফল্যের শেষ ধাপ হতে পারে না। বরং প্রশিক্ষণের পর তার পাঠদানে কী পরিবর্তন এসেছে, শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফলে কোনো উন্নতি হয়েছে কি না এবং প্রশিক্ষণের কোন বিষয়গুলো বাস্তবে প্রয়োগ হচ্ছে—এসব তথ্য নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি একটি ‘পোস্ট-ট্রেনিং ক্লাসরুম অ্যাসেসমেন্ট’ বা প্রশিক্ষণ-পরবর্তী শ্রেণিকক্ষ মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।

এর আওতায় প্রশিক্ষণের কয়েক মাস পর সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। তিনি প্রশিক্ষণে শেখানো কৌশল প্রয়োগ করছেন কি না, শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কতটা, পাঠ পরিকল্পনা অনুসরণ করছেন কি না এবং শিক্ষার্থীরা বিষয়টি কতটা আয়ত্ত করতে পারছে—এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট সূচকের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে ইউআরসি, উপজেলা শিক্ষা অফিস এবং অভিজ্ঞ শিক্ষক বা একাডেমিক সুপারভিশন কাঠামোর সমন্বিত ভূমিকা থাকতে পারে।

শুধু ত্রুটি ধরার জন্য নয়, শিক্ষকের প্রয়োজনীয় সহায়তা নির্ধারণের জন্যও এই মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিক্ষক প্রশিক্ষণের বিষয় বুঝতে বা প্রয়োগ করতে সমস্যায় পড়লে তাকে পুনরায় সহায়তা, মেন্টরিং বা নির্দিষ্ট বিষয়ের কোচিং দেওয়া যেতে পারে।

শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণের কথা উঠলেই অনেকের মধ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। কিন্তু কার্যকর একাডেমিক মনিটরিংয়ের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শাস্তি দেওয়া নয়; বরং শিক্ষককে আরও দক্ষ করে তোলা।

একজন শিক্ষক ভালো করছেন—তার ভালো পদ্ধতি অন্য শিক্ষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। আবার কোথাও দুর্বলতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।

এভাবে প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ, শিক্ষককে প্রতিক্রিয়া দেওয়া এবং পুনরায় সহায়তা—এই চারটি ধাপকে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় আনা গেলে প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা বাড়তে পারে।

প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নের জন্য নতুন ভবন, ডিজিটাল উপকরণ, বই কিংবা শিক্ষক প্রশিক্ষণ—সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিক্ষার মান নির্ধারিত হয় শ্রেণিকক্ষের ভেতরে।

একজন শিক্ষক কীভাবে পড়াচ্ছেন, শিক্ষার্থী কীভাবে শিখছে এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণে পাওয়া জ্ঞান বাস্তবে কতটা প্রয়োগ করছেন—এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তাই প্রশ্নটি শুধু ‘কতজন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে’ হওয়া উচিত নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—প্রশিক্ষণের পর কতজন শিক্ষক তাদের পাঠদানে পরিবর্তন এনেছেন? সেই পরিবর্তন কে মাপছেন? এবং শিক্ষার্থীরা তার সুফল কতটা পাচ্ছে?

প্রাথমিক শিক্ষায় প্রশিক্ষণের পেছনে সরকারি অর্থ ব্যয় অব্যাহত থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হলে প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে নজর সরিয়ে শ্রেণিকক্ষের দিকে নজরদারি বাড়ানো জরুরি।

শিক্ষকের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন, প্রশাসনিক কার্যক্রমও নিয়মের মধ্যে রাখা প্রয়োজন। কিন্তু এর পাশাপাশি যদি শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে শুধু উপস্থিতির হিসাব দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মানোন্নয়ন সম্ভব নয়।

প্রশিক্ষণের সাফল্য প্রশিক্ষণকক্ষে নয়—তার প্রকৃত পরীক্ষা হয় শ্রেণিকক্ষে। এখন সেই পরীক্ষার মূল্যায়ন ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সেটিই দেখার বিষয়।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত