সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর বিদেশি নাগরিকদের মরদেহ পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়া হচ্ছে না—এমন অভিযোগ সামনে এসেছে। এর ফলে প্রিয়জনকে শেষবারের মতো দেখার পাশাপাশি ধর্মীয় রীতি মেনে সমাহিত করার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে অনেক পরিবার।
মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, একজন ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর তার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর না করা শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এর মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিবারও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে পড়ছে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে এমন কয়েকটি পরিবারের কথা তুলে ধরা হয়েছে, যারা সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া স্বজনদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়নি।
একই দিনে পাঁচ ইথিওপীয়র মৃত্যুদণ্ড
চলতি বছরের ২৩ জুন দক্ষিণ সৌদি আরবের আসির প্রদেশের খামিস মুশাইত কারাগারে মাদক পাচারের অভিযোগে পাঁচ ইথিওপীয় নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাদের একজন ছিলেন ২৫ বছর বয়সী কিব্রম কিনফে আরেগাউই।
কিব্রমের বাবা কিনফে আরেগাউই বলেন, ছেলের মৃত্যুর পর পরিবার দেশে প্রতীকীভাবে শেষকৃত্যের আয়োজন করলেও মরদেহ না পাওয়ার কারণে প্রকৃত অর্থে তিনি শোক কাটিয়ে উঠতে পারছেন না।
তার ভাষায়, পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়েছে। কিন্তু ছেলের মরদেহ নিজের চোখে দেখতে না পারার কষ্ট তার জন্য আজীবন থেকে যাবে।
ইথিওপিয়ার অর্থোডক্স খ্রিস্টান পরিবারগুলোর কাছে ধর্মীয় রীতি মেনে মৃত স্বজনকে সমাহিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিব্রমের পরিবার সেই সুযোগও পায়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেলের মৃত্যুর খবর
কিব্রম প্রথমবার ২০২০ সালে বাবার সঙ্গে বৈধ ভিসা ছাড়াই সৌদি আরবে প্রবেশ করেন। পরে তাদের গ্রেপ্তার করে প্রায় ১৫ মাস কারাগারে রাখা হয় এবং এরপর ইথিওপিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়।
ইথিওপিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কিব্রম আবার সৌদি আরবে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। লোহিত সাগর পাড়ি দিতে অতিরিক্ত যাত্রী বহনকারী একটি নৌকায় ওঠেন তিনি। পরে পায়ে হেঁটে ইয়েমেন অতিক্রম করেন।
২০২৩ সালে সৌদি সীমান্ত পার হওয়ার সময় তাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ আনা হয়। কিব্রমের বাবা জানান, প্রায় তিন মাস কারাগারে থাকার পর তাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। প্রায় তিন বছর কারাগারে থাকার পর চলতি বছরের জুনে হঠাৎ তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগও কিব্রম পাননি বলে দাবি করেন তার বাবা।
কিনফে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেই তিনি ছেলের মৃত্যুর খবর জানতে পারেন।
তার দাবি, কিব্রম মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন—এমন কোনো প্রমাণ পরিবারকে দেখানো হয়নি। এমনকি ছেলের মৃত্যুসনদ, ব্যক্তিগত কোনো সামগ্রী কিংবা মরদেহও তারা পাননি।
বিয়ের অপেক্ষায় থাকা ছেলের বদলে আয়োজন হলো প্রতীকী শেষকৃত্য
একই দিন খামিস মুশাইত কারাগারে ২৬ বছর বয়সী আরেক ইথিওপীয় নাগরিক সিগাবু গেব্রেমারিয়ামের মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর করা হয়।
তিগ্রায় অঞ্চলের একটি গ্রামীণ এলাকার আট ভাইবোনের মধ্যে সিগাবু ছিলেন সবার বড়। ১৮ বছর বয়সের পর দারিদ্র্য ও গৃহযুদ্ধের কারণে তিনি বাড়ি ছাড়েন। পরিবারের আর্থিক সহযোগিতার জন্যই তিনি সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন বলে জানান তার বাবা হাগোস গেব্রেমেস্কেল।
সিগাবু মাদক পাচারের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে সাড়ে তিন বছর কারাগারে ছিলেন। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে ফেব্রুয়ারিতে পরিবারের সঙ্গে শেষবার কথা হয় তার।
বাবাকে তিনি জানিয়েছিলেন, শিগগিরই দেশে ফিরে বিয়ে করবেন।
ছেলের জন্য পাত্রীও খুঁজছিলেন সিগাবুর মা লেতেখ্রিস্টোস। কিন্তু ছেলের বিয়ের প্রস্তুতির পরিবর্তে শেষ পর্যন্ত তাকে প্রতীকী শেষকৃত্য ও প্রার্থনার আয়োজন করতে হয়েছে।
সৌদি আরবে থাকা স্বজনদের কাছ থেকে সিগাবুর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পেয়ে পরিবার স্থানীয় একটি গির্জায় প্রার্থনা ও প্রতীকী শেষকৃত্যের আয়োজন করে।
তার মা ঐতিহ্য অনুযায়ী ৪০ দিনের শোক পালন করছেন। কিন্তু ছেলের মরদেহ দেশে না ফেরায় সেই শোক আরও ভারী হয়ে উঠেছে বলে জানান তিনি।
‘মরদেহ ফেরত না দেওয়া পরিবারের ওপরও শাস্তি’
ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের জ্যেষ্ঠ গবেষক এবং রিপ্রিভ মেনার কেসওয়ার্ক কনসালট্যান্ট দুয়া ধাইনি বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির মরদেহ পরিবারের কাছে ফেরত না দেওয়া নিছক প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তার মতে, এর মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিবারও এক ধরনের শাস্তির মুখে পড়ে।
ধর্ম ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক নাজিলা ঘানেয়াও সৌদি আরবে মরদেহ আটকে রাখার অভিযোগকে ‘নির্যাতন ও নিপীড়ন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সৌদিতে মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা বাড়ছে
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ জুলাই পর্যন্ত আগের এক বছরে সৌদি আরবে ১১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যায় চীন ও ইরানের পর সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ।
ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের হিসাবে, ২০১৫ সালে বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ ক্ষমতায় আসার পর থেকে সৌদি আরবে দুই হাজারের বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে ৪২ শতাংশই বিদেশি নাগরিক।
সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই সৌদি আরবে ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে—এক বছরে দেশটির সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের রেকর্ড।
মাদক মামলায় বিদেশিদের মৃত্যুদণ্ড বেশি
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গত বছর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৭৫ শতাংশ বিদেশি নাগরিক।
দুয়া ধাইনি বলেন, মাদক পাচারকারী চক্রগুলো অনেক সময় দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে কাজে লাগায়। ইথিওপিয়ার কিছু মামলায় আটক ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সীমান্ত পার হওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে তাদের বিভিন্ন জিনিস বহন করতে প্ররোচিত করা হয়েছিল।
এ ছাড়া কিছু পাকিস্তানি নাগরিককে নিষিদ্ধ পদার্থ গিলতে বাধ্য করার ঘটনাও নথিবদ্ধ হয়েছে বলে জানান তিনি।
আইন থাকলেও মরদেহ ফেরতের নজির কোথায়?
সৌদি আইনে দূতাবাসের খরচে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির মরদেহ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাস্তবে এমন ঘটনা সম্পর্কে তারা জানেন না বলে দাবি করেন দুয়া ধাইনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো অভিবাসী নাগরিকের মরদেহ পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে—এমন ঘটনা তাদের জানা নেই। সৌদি নাগরিকদের ক্ষেত্রেও তাদের নথিবদ্ধ করা কিছু ঘটনায় একই পরিস্থিতি দেখা গেছে।
অতীতে তুরস্ক ও জর্ডানের কয়েকটি পরিবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া স্বজনদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রচারণা চালালেও সফল হয়নি বলে জানান তিনি।
জর্ডানের একটি পরিবারের হাতে দেওয়া মৃত্যুসনদে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত তথ্য ছিল বলেও জানান ধাইনি। সেখানে মৃতদেহ কোথায় সমাহিত করা হয়েছে কিংবা কী পরিস্থিতিতে ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে—সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু উল্লেখ ছিল না।
সৌদি সরকারের বক্তব্য মেলেনি
বিবিসি এ বিষয়ে সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং লন্ডনে দেশটির দূতাবাসের কাছে মন্তব্য চেয়েছিল। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
ইথিওপিয়ায় সৌদি দূতাবাসের কাছেও মন্তব্য জানতে চাওয়া হয়েছে।
সৌদি আরবে বর্তমানে কতজন বন্দী মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় রয়েছেন, সে তথ্য সরকার প্রকাশ করে না। তবে মানবাধিকারকর্মীদের ধারণা, এই সংখ্যা কয়েক শ হতে পারে।
‘রক্ষীরা দরজা খুললেই মনে হয়, এরপর কার পালা’
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিভাগের গবেষক জোই শিয়া বলেন, কোনো পূর্ব সতর্কতা বা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ ছাড়াই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা বন্দী ও তার পরিবারকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে।
বিবিসির সঙ্গে কথা বলা সৌদি আরবের এক বন্দীও নিজের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। নিরাপত্তার কারণে তার পরিচয় ও অবস্থান প্রকাশ করা হয়নি।
ওই ব্যক্তি জানান, ২০২৩ সালে মাদক পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এখনো ক্ষমা পাওয়ার আশায় আছেন তিনি।
তার দাবি, চলতি বছর তিনি ১৫ জন সহবন্দীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে দেখেছেন। ফলে প্রতিটি মুহূর্তেই নিজের মৃত্যুর আশঙ্কায় দিন কাটছে তার।
তিনি বলেন, কারাগারের রক্ষীরা যখনই দরজা খোলেন, বন্দীদের মনে হয়—এবার হয়তো তাদের মধ্য থেকেই কারও পালা।
শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেও অন্তত মরদেহ যেন পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানো হয়—এটাই এখন তার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
তার কথায়, ‘আমি চিন্তায় থাকি যে আমার বাবা-মা হয়তো আমার মৃতদেহটাও দেখতে পারবেন না।’
সূত্র: বিবিসি
বিয়ের প্রলোভনে তরুণীকে ধর্ষণ, এনসিপি নেতার বিরুদ্ধে মামলা
ইরানি পাহাড়ে ৫০ ঘণ্টা লুকিয়ে থাকার 'ভয়ংকর অভিজ্ঞতা' জানালেন মার্কিন সেনা
গাজার হাসপাতালে ডিজেল সরবরাহ বন্ধ করছে ডব্লিউএইচও
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে যোগ দিলো ন্যাটো!
সৌদির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে পাকিস্তানের তৎপরতা