ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ ও আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রভাব ক্রমেই সৌদি আরবের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের নতুন করে সংঘাত, সৌদি ভূখণ্ডে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা এবং মক্কাকে ঘিরে সর্বশেষ নিরাপত্তা সতর্কতা—সব মিলিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বুধবার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট দাবি করেছে, মক্কার দক্ষিণে একটি হুথি ড্রোন শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ড্রোনটি মক্কার নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই ভূপাতিত করা হয়। জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি বলেছেন, দুই পবিত্র মসজিদ ও হাজিদের নিরাপত্তা সৌদি আরবের জন্য ‘রেড লাইন’।
তবে হুথি কর্মকর্তারা মক্কাকে লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। হুথিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য হাজেম আল-আসাদ সৌদি দাবিকে ‘মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে ড্রোনটির প্রকৃত লক্ষ্য কী ছিল, সে বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
মক্কায় জরুরি সতর্কতা
ড্রোনের ঘটনাটির আগে মঙ্গলবার মক্কা ও সৌদি আরবের আরও কয়েকটি এলাকায় নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। এটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের মধ্যে মক্কাকে ঘিরে একটি বিরল নিরাপত্তা পরিস্থিতি।
সৌদি কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপের পরদিনই মক্কার দক্ষিণে ড্রোন ধ্বংসের দাবি সামনে আসে। এর ফলে পবিত্র নগরীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ে।
মক্কার বিষয়টি বিশেষভাবে সংবেদনশীল। কারণ মসজিদুল হারাম ও কাবা শরিফ বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের কাছে সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরুত্ব বহন করে। ফলে পবিত্র নগরীর কাছাকাছি কোনো সামরিক তৎপরতা আঞ্চলিক সংঘাতের বাইরেও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি করছে।
সৌদিতে ইরানি হামলার আশঙ্কা দেখছে যুক্তরাষ্ট্র
মক্কার ঘটনাটির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রও সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে।
রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসের ভ্রমণ-সংক্রান্ত সতর্কতায় সৌদি আরবে মার্কিন স্বার্থের ওপর ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মার্কিন নাগরিকদের সৌদি আরব ভ্রমণ পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সতর্কতায় সশস্ত্র সংঘাত, সন্ত্রাসবাদ এবং ইয়েমেন সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় নিরাপত্তা ঝুঁকির কথাও বলা হয়েছে।
এর অর্থ হলো, সৌদি আরবের নিরাপত্তা ঝুঁকি এখন শুধু ইয়েমেন সীমান্ত বা হুথিদের হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইরান-সংক্রান্ত বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতও সৌদি ভূখণ্ডের নিরাপত্তা হিসাবের অংশ হয়ে উঠছে।
হুথিদের হামলা বাড়ছে
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে হুথিদের হামলা বেড়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইয়েমেন থেকে চালানো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ১৩ জন আহত হয়েছেন। মক্কার কাছাকাছি ড্রোন ধ্বংসের ঘটনাটিও এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই ঘটেছে।
এদিকে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, দীর্ঘ যুদ্ধের মধ্যেও হুথিদের সামরিক সক্ষমতা বেড়েছে। তাদের হাতে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, নৌ ড্রোন এবং জাহাজবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে। এসব সক্ষমতার একটি অংশ স্থানীয়ভাবে তৈরি হলেও ইরানের সহায়তা ও আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তেলের অবকাঠামোও ঝুঁকিতে
সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো।
সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন সাম্প্রতিক হামলার পর বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা যায়—যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশের সমান।
এই পাইপলাইন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির একটি বিকল্প পথ হিসেবে এটি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। ফলে হরমুজে সংকটের পাশাপাশি সৌদি আরবের বিকল্প তেল পরিবহন অবকাঠামোও যদি হামলার মুখে পড়ে, তাহলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ আরও বাড়তে পারে।
হরমুজ থেকে বাব আল-মান্দাব—একাধিক ফ্রন্ট
ইরান যুদ্ধের প্রভাব শুধু আকাশপথ বা সৌদি ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়। মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ—হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দাব—নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।
হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। অন্যদিকে বাব আল-মান্দাব লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ। ইয়েমেনে হুথিদের সামরিক অগ্রগতি এবং লোহিত সাগর অঞ্চলে তাদের তৎপরতা এই নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ফলে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ এখন শুধু ইরান-ইসরায়েল বা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ইয়েমেন, সৌদি আরব, লোহিত সাগর এবং উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামোও এর প্রভাববলয়ে চলে আসছে।
সামনে কী?
মক্কার কাছে ড্রোন ধ্বংসের সৌদি দাবি এবং হুথিদের অস্বীকার—দুই পক্ষের বক্তব্যই এখন পর্যন্ত আলাদা। কিন্তু ঘটনাটি একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে: চলমান আঞ্চলিক সংঘাত সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিবেশকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে।
একদিকে সৌদি আরব হুথিদের সামরিক তৎপরতাকে সরাসরি নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবে ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি উল্লেখ করে নাগরিকদের সতর্ক করেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তেল পাইপলাইন, বন্দর, নৌপথ ও সামরিক স্থাপনার ঝুঁকি। ফলে সংঘাতের বিস্তার এখন শুধু সামরিক প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে পবিত্র নগরীর নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ।
মক্কার আকাশে সাম্প্রতিক ড্রোনের ঘটনা তাই বৃহত্তর আঞ্চলিক সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে—যেখানে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের অভিঘাত ক্রমেই ইয়েমেন পেরিয়ে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে।