২০২৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কয়েক মুহূর্তের জন্য জরুরি নিরাপত্তা সতর্কতা জারি হয়েছিল মক্কায়। ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার মধ্যে পবিত্র নগরীর বাসিন্দাদের সম্ভাব্য বিপদের বিষয়ে সতর্ক করা হয়। পরে সেই সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়।
পরদিন সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানায়, মক্কার দক্ষিণে একটি হুথি ড্রোন শনাক্ত ও ধ্বংস করা হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, ড্রোনটি পবিত্র নগরীর নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই ভূপাতিত করা হয়। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি বলেন, দুই পবিত্র মসজিদ ও হাজিদের নিরাপত্তা সৌদি আরবের জন্য ‘রেড লাইন’। তবে হুথিরা মক্কাকে লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ঘটনাটি স্বাভাবিকভাবেই প্রায় পাঁচ দশক আগের আরেক ভয়াবহ অধ্যায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়—যখন বাইরের কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন নয়, বরং একটি সশস্ত্র দল সরাসরি দখল করে নিয়েছিল ইসলামের পবিত্রতম স্থান মসজিদুল হারাম।
১৯৭৯ সালের সেই সকাল
১৯৭৯ সালের ২০ নভেম্বর। ইসলামি বর্ষপঞ্জির নতুন বছর ১৪০০ হিজরির প্রথম দিন। ফজরের নামাজ শেষ হয়েছে মাত্র। মক্কার মসজিদুল হারামে তখন হাজার হাজার মুসল্লি। হঠাৎ মসজিদের ভেতরে শুরু হয় বিশৃঙ্খলা। এরপর শোনা যায় গুলির শব্দ।
সৌদি ন্যাশনাল গার্ডের সাবেক সদস্য ও ধর্মীয় প্রচারক জুহাইমান আল-উতাইবি এবং তার অনুসারীরা মসজিদুল হারামের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় তাদের সংখ্যা প্রায় ৩০০ থেকে ৬০০ বলা হয়েছে।
বিদ্রোহীরা আগে থেকেই অস্ত্র মসজিদে নিয়ে এসেছিল। ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, জানাজার জন্য ব্যবহৃত কফিনের ভেতর লুকিয়ে অস্ত্র আনা হয়েছিল এবং পরে সেগুলো অনুসারীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
এরপর মসজিদের মাইক্রোফোন দখল করে বিদ্রোহীরা ঘোষণা করে—প্রতীক্ষিত মাহদি এসে গেছেন। তাদের নেতা মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল-কাহতানিকে তারা সেই মাহদি হিসেবে ঘোষণা করে।
কেন বিদ্রোহ?
জুহাইমান ও তার অনুসারীদের বিদ্রোহকে বোঝার জন্য সে সময়ের সৌদি আরবের পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ।
তেলসম্পদ সৌদি আরবের অর্থনীতি ও সমাজকে দ্রুত বদলে দিচ্ছিল। নতুন অবকাঠামো তৈরি হচ্ছিল, বিদেশি প্রভাব বাড়ছিল এবং রাজপরিবারের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক গভীর হচ্ছিল।
জুহাইমানের অনুসারীরা এসব পরিবর্তনের বিরোধিতা করত। তাদের অভিযোগ ছিল, সৌদি রাজপরিবার ইসলামী মূল্যবোধ থেকে সরে যাচ্ছে এবং রাষ্ট্রে পশ্চিমা প্রভাব বাড়ছে।
তাদের বক্তব্যে রাজপরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ধর্মীয় বিচ্যুতির অভিযোগও ছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জ করা এবং নিজেদের ধারণা অনুযায়ী আরও কঠোর ইসলামী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
মসজিদের ভেতরেই শুরু হলো যুদ্ধ
মসজিদুল হারাম দখলের ঘটনা সৌদি কর্তৃপক্ষের জন্য ছিল নজিরবিহীন সংকট। মসজিদের মিনার, বিভিন্ন কক্ষ, করিডর এবং ভূগর্ভস্থ অংশে অবস্থান নেয় সশস্ত্র বিদ্রোহীরা। ফলে বাইরে থেকে অভিযান চালিয়ে তাদের সরিয়ে দেওয়া সহজ ছিল না।
সৌদি নিরাপত্তা বাহিনী প্রথমে মসজিদ ঘিরে ফেলে। পরে বিশেষ বাহিনী ও সামরিক ইউনিটকে অভিযানে নামানো হয়।
কিন্তু একটি বড় ধর্মীয় ও আইনি বাধা ছিল—মক্কার পবিত্র সীমানার মধ্যে যুদ্ধ ও রক্তপাত নিয়ে ইসলামী আইনে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত সৌদি ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের অনুমোদন নেওয়া হয়। এরপর মসজিদ পুনর্দখলের অভিযান আরও জোরদার হয়।
ভূগর্ভস্থ গোলকধাঁধায় আটকে বিদ্রোহীরা
সৌদি বাহিনী ধীরে ধীরে মসজিদের বিভিন্ন অংশ পুনর্দখল করলেও বিদ্রোহীদের বড় একটি অংশ নিচের কক্ষ, টানেল ও ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় আশ্রয় নেয়।
এতে অভিযান দীর্ঘায়িত হয়।
অবরোধ প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলে। সৌদি বাহিনীকে ভূগর্ভস্থ অংশে ঢুকতে বিশেষ কৌশল নিতে হয়।
এই পর্যায়ে সৌদি আরব ফ্রান্সের কাছ থেকেও সহায়তা চায়। ফরাসি বিশেষজ্ঞরা অভিযানের পরিকল্পনায় পরামর্শ দেন এবং বিশেষ ধরনের অপ্রাণঘাতী গ্যাস সরবরাহের সঙ্গে তাদের সহায়তার উল্লেখ পাওয়া যায়।
‘গ্যাস দিয়ে বের করে আনা’
বিদ্রোহীদের ভূগর্ভস্থ অবস্থানগুলোতে সরাসরি প্রবেশ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল। তাই শেষ পর্যায়ে গ্যাস ব্যবহার করে তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ভূগর্ভস্থ কক্ষ ও অবস্থানগুলোতে গ্যাস পৌঁছানোর জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় ছিদ্র করা হয়। এরপর সেখানে গ্যাস প্রবেশ করানো হয় এবং নিরাপত্তা বাহিনী ধীরে ধীরে ভূগর্ভস্থ অংশে অগ্রসর হয়।
ঐতিহাসিক সূত্রগুলোতে গ্যাসটির ধরন ও ব্যবহারের পদ্ধতি নিয়ে কিছু পার্থক্য রয়েছে। তবে ফরাসি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় বিশেষ ধরনের টিয়ার গ্যাস ব্যবহারের কথা একাধিক বর্ণনায় পাওয়া যায়। শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহীদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে।
১৪ দিনের অবরোধের সমাপ্তি
মসজিদুল হারাম দখলের ঘটনা ২০ নভেম্বর শুরু হয়ে ৪ ডিসেম্বর ১৯৭৯-এ শেষ হয়—অর্থাৎ প্রায় ১৪ দিন ধরে পবিত্র মসজিদটি সশস্ত্র সংঘর্ষের কেন্দ্রে ছিল। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, কয়েকশ বিদ্রোহীর মধ্যে শেষ পর্যন্ত প্রায় শতাধিক জীবিত অবস্থায় আত্মসমর্পণ করে।
জুহাইমান আল-উতাইবিকেও জীবিত আটক করা হয়। এরপর সৌদি কর্তৃপক্ষ তাকে এবং আরও ৬২ জন আটক বিদ্রোহীকে ১৯৮০ সালের ৯ জানুয়ারি প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তাদের বিভিন্ন সৌদি শহরে একই দিনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
শুধু একটি অবরোধ ছিল না
মসজিদুল হারামের এই দখলদারিত্ব সৌদি আরবের জন্য কেবল নিরাপত্তা সংকট ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্র, ধর্মীয় কর্তৃত্ব এবং রাজপরিবারের বৈধতা নিয়ে গভীর প্রশ্নের বহিঃপ্রকাশ।
বিদ্রোহীরা রাজপরিবারের বিরুদ্ধে ইসলামী মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত হওয়ার অভিযোগ তুলেছিল। ফলে হামলার পর সৌদি রাষ্ট্র ধর্মীয় রক্ষণশীলতার দিকে আরও জোরালোভাবে ঝুঁকে যায়—এমন বিশ্লেষণ বহু ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়।
পরবর্তী কয়েক দশকে সৌদি সমাজে ধর্মীয় বিধিনিষেধ ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের প্রভাব ছিল গভীর। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে সেই বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন এসেছে।
২০২৬: পরিস্থিতি আলাদা, উদ্বেগের জায়গা একই
প্রায় ৪৭ বছর পর মক্কার আকাশে ড্রোন নিয়ে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে ১৯৭৯ এবং ২০২৬ সালের ঘটনাকে এক করে দেখা যাবে না।
১৯৭৯ সালে মসজিদুল হারাম সরাসরি দখল করেছিল একটি সশস্ত্র অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহী গোষ্ঠী। তারা মসজিদের ভেতরে অবস্থান নিয়ে প্রায় দুই সপ্তাহ সৌদি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের ঘটনাটি একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের অংশ। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, মক্কার দক্ষিণে একটি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে এবং সেটি নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই আটকানো হয়। হুথিরা মক্কাকে লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
অর্থাৎ পরিস্থিতি, পক্ষ এবং যুদ্ধের ধরন—সবই আলাদা। কিন্তু একটি বিষয় অপরিবর্তিত: মক্কার নিরাপত্তার প্রশ্ন।
মক্কা শুধু সৌদি আরবের একটি শহর নয়। এখানে রয়েছে কাবা শরিফ এবং মসজিদুল হারাম—বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের নামাজের দিকনির্দেশের কেন্দ্র এবং হজ ও ওমরাহর প্রধান গন্তব্য।
তাই ১৯৭৯ সালের মতো সরাসরি দখলদারিত্ব হোক কিংবা ২০২৬ সালের মতো আকাশপথের হুমকির অভিযোগ—মক্কাকে ঘিরে যেকোনো নিরাপত্তা ঘটনা ধর্মীয় আবেগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মনোযোগও তৈরি করে।
১৯৭৯ সালের অবরোধ ইতিহাসে রেখে গেছে এক অভূতপূর্ব অধ্যায়: ইসলামের পবিত্রতম মসজিদও রাজনৈতিক সহিংসতার বাইরে নয়—এমন বাস্তবতার নির্মম প্রকাশ।
আর ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক ঘটনা সেই ইতিহাসকে নতুন করে আলোচনায় ফিরিয়ে এনেছে। সূত্র: এনডিটিভি
‘হরমুজ ও বাব আল-মান্দাবকে দর-কষাকষির হাতিয়ার করা যাবে না’
কেশম দ্বীপে মার্কিন ড্রোন ভূপাতিতের দাবি ইরানের
নিজেদের তৈরি ক্ষেপণাস্ত্রে সৌদির এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত: দাবি হুথিদের
আগে টাকা দেবে যুক্তরাষ্ট্র, সেই অর্থেই অস্ত্র কিনবে ইসরায়েল