ইয়েমেন কোনো দেশের রাজনৈতিক দর-কষাকষির হাতিয়ার নয় বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরাহ আল-জুবা। তিনি বলেছেন, ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার ইয়েমেনিদেরই এবং তা রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হতে হবে।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) ইয়েমেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
আফরাহ আল-জুবা বলেন, অন্য কোনো অঞ্চলে কোনো পক্ষের ক্ষতি বা রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হওয়ার ক্ষতিপূরণ হিসেবে ইয়েমেনকে ব্যবহার করা যাবে না। একইভাবে ইয়েমেনকে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক বিরোধ মেটানোর ক্ষেত্র বা নিজেদের আলোচনার অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা উচিত নয়।
তিনি বলেন, “ইয়েমেন কারও ক্ষতির ক্ষতিপূরণ নয়, প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষেত্র নয় এবং কোনো আঞ্চলিক শক্তির দর-কষাকষির হাতিয়ারও নয়।”
ইয়েমেনের উপকূল, বন্দর ও দ্বীপগুলোর ওপর দেশটির রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও নৌ চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন ইয়েমেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
বিশেষ করে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার অভিযোগ, ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় হুথিদের অগ্রগতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করেছে।
বাব আল-মান্দাব লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনে এই জলপথের কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।
আফরাহ আল-জুবা ইরানের বিরুদ্ধে হুথিদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা দেওয়ার অভিযোগও করেছেন।
তিনি বলেন, ইয়েমেনের ভূগোল ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশ এবং আন্তর্জাতিক নৌপথের ওপর চাপ তৈরির মতো কর্মকাণ্ডকে তারা প্রত্যাখ্যান করেন।
তবে ইরান ও হুথিরা বিভিন্ন সময়ে নিজেদের সম্পর্ক এবং সামরিক সহযোগিতা নিয়ে ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছে। ফলে ইয়েমেন সরকারের এই অভিযোগকে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইয়েমেনের বর্তমান সংকট যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের আগে থেকেই চলমান ছিল বলে উল্লেখ করেন ইয়েমেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তার মতে, বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও যুক্ত হয়েছে।
ইয়েমেনে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার ও হুথিদের মধ্যে সংঘাত চলছে। হুথিরা দেশটির রাজধানী সানা ও পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দেশের অন্যান্য অংশে কর্তৃত্ব ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব ঘিরে হুথিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। এসব কর্মকাণ্ডের প্রভাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর পড়েছে।
ইয়েমেন সরকারের বক্তব্য হলো, দেশের সমুদ্রসীমা, বন্দর ও দ্বীপগুলোর ওপর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা গেলে শুধু অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলাই নয়, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবের নৌ চলাচলের নিরাপত্তাও জোরদার করা সম্ভব হবে।
তবে ইয়েমেন সংকটের রাজনৈতিক সমাধান কতটা দ্রুত সম্ভব হবে, তা দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমঝোতা এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের গতিপথের ওপরও নির্ভর করছে।