শুধু সৌদি জাহাজে হামলা করবে হুথিরা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন বৈঠক

ইয়েমেনের হুথি প্রতিনিধিদের সঙ্গে ওমানের রাজধানী মাসকাটে বৈঠক করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা ও কৌশলগত বাব আল-মান্দাব প্রণালির ওপর হুথিদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার হওয়ার পর এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

রয়টার্সের পাঁচটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত সপ্তাহান্তে মাসকাটে মার্কিন দূতাবাসে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। ওমান দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে এবং দেশটির সহায়তায় বৈঠকটি আয়োজন করা হয় বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

বৈঠকে হুথিদের পক্ষ থেকে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুস সালাম ও আবদেলমালিক আল-আজিরি উপস্থিত ছিলেন বলে রয়টার্স জানিয়েছে। আবদুস সালাম যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন।

বৈঠকে হুথি প্রতিনিধিরা মার্কিন কর্মকর্তাদের আশ্বস্ত করেছেন যে লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজে হামলার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। একই সঙ্গে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও হুথিদের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতির প্রতি তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানিয়েছে।

একটি ইয়েমেনি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, হুথিরা ইসরায়েলি জাহাজ বা অন্যান্য বাণিজ্যিক জাহাজেও হামলা করবে না বলে জানিয়েছে। তবে সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে এই নিশ্চয়তার বাইরে রাখা হয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বৈঠকটি সরাসরি নিশ্চিত করেনি। তবে তারা জানিয়েছে, লোহিত সাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষা এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ।

এই বৈঠকের সময়ই ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে হুথিদের সামরিক অগ্রগতি নতুন মাত্রা পেয়েছে। কয়েক দিনের অভিযানে তারা হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা দখলে নেয় এবং গুরুত্বপূর্ণ বন্দর মোখা ও বাব আল-মান্দাবের কাছে পেরিম দ্বীপের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

বাব আল-মান্দাব লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক chokepoint। এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বাণিজ্যিক পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনে এই পথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

হুথিদের হাতে প্রণালির আশপাশের উপকূল ও দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

হুথিদের অগ্রগতির মুখে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে Axios জানিয়েছে।

সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলে হুথিদের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলার অনুরোধ করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে ট্রাম্প সরাসরি সামরিক অভিযানে যেতে রাজি হননি।

ওয়াশিংটন রিয়াদকে সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নেওয়ার অবস্থান জানালেও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তার মতো সহযোগিতা দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এরই মধ্যে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (CENTCOM) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার সৌদি আরব সফর করে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি উঠে আসে।

হুথিদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের এই যোগাযোগ মধ্যপ্রাচ্যের চলমান বৃহত্তর সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক চাপ বাড়িয়েছে। এর মধ্যে ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে হতে পারে।

বিশ্লেষকদের কাছে তাই মাসকাটের বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—হুথিদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধের পরিবর্তে নৌপথ নিরাপদ রাখার জন্য একটি সীমিত সমঝোতার চেষ্টা। তবে আল-জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হুথিদের দেওয়া আশ্বাসের ওপর নির্ভর করা ছাড়া ওয়াশিংটনের সামনে এই মুহূর্তে সীমিত বিকল্পও থাকতে পারে।

এদিকে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সংঘাত তীব্র হলে বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা, লোহিত সাগরের বাণিজ্যিক নৌপথ এবং সৌদি তেল রপ্তানি—তিন ক্ষেত্রেই নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

ফলে মাসকাটের বৈঠক শুধু যুক্তরাষ্ট্র-হুথি সম্পর্কের জন্য নয়, পুরো লোহিত সাগর অঞ্চলের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।