ইয়েমেনে ২৪ ঘণ্টায় সৌদির ২৬ বিমান হামলা, দাবি হুথিদের

ইয়েমেনে যুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার মধ্যে সৌদি আরব গত ২৪ ঘণ্টায় হুথি নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন এলাকায় ২৬টি হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা।

শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) হুথিরা আরও দাবি করে, গত এক সপ্তাহে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সৌদি হামলার সংখ্যা ৩০০-তে পৌঁছেছে। এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

হুথিদের দাবি অনুযায়ী, সৌদি যুদ্ধবিমান ইয়েমেনের তায়েজ, হাজ্জাহ, মারিব, আল-জাওফ, আল-বায়দা, আমরান, লাহিজ, হোদেইদা ও সাদাসহ বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালিয়েছে। একটি প্রতিবেদনে হুথিদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, খামিস মুশাইত ও তাইফের বিমানঘাঁটি থেকে সৌদি এফ-১৫ ও টাইফুন যুদ্ধবিমান এসব অভিযানে ব্যবহৃত হয়েছে।

তবে এসব হামলার বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ কোনো নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার জানিয়েছে, তায়েজ প্রদেশের আল-ওয়াজিয়াহ এলাকায় সংঘর্ষে তারা ৩০ জন হুথি যোদ্ধাকে হত্যা এবং ৬০ জনের বেশি আহত করেছে। হুথিদের পক্ষ থেকে এই সংখ্যার স্বাধীন কোনো নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।

ইয়েমেনে ২০২২ সালের পর কয়েক বছর তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকা যুদ্ধ পরিস্থিতি সাম্প্রতিক সময়ে আবার দ্রুত উত্তপ্ত হয়েছে। বিশেষ করে তায়েজ ও পশ্চিম উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে সংঘর্ষ বেড়েছে।

হুথিরা একই সঙ্গে লোহিত সাগরের উপকূল বরাবর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে। কৌশলগত বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছাকাছি তাদের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ায় আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সৌদি হামলার অভিযোগ এবং মক্কাকে লক্ষ্য করে ড্রোন পাঠানোর সৌদি অভিযোগের প্রতিবাদে শুক্রবার ইয়েমেনের রাজধানী সানায় বড় বিক্ষোভ হয়েছে। হুথি সমর্থকেরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন এবং সংগঠনের নেতা আবদুল মালিক আল-হুথির ছবি বহন করেন।

এর আগে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছিল, মক্কার দক্ষিণে একটি হুথি ড্রোন প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে। সৌদি পক্ষের দাবি, ড্রোনটি মক্কার নিষিদ্ধ আকাশসীমার দিকে যাচ্ছিল। হুথিরা অবশ্য মক্কা বা কোনো ধর্মীয় স্থাপনা লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

তাইফ প্রদেশে ওই ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে একজন নিহত ও দুজন আহত হওয়ার কথাও সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

ইয়েমেনে সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সৌদি আরবের অভ্যন্তরেও নিরাপত্তা সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রিয়াদসহ একাধিক শহরে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়।

শুক্রবার রাতে রিয়াদে সতর্কতা জারির পর বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় বলে এএফপির সাংবাদিকরা জানিয়েছেন। প্রায় আধা ঘণ্টা পর সৌদি সিভিল ডিফেন্স জানায়, বিপদ কেটে গেছে।

এর আগে মক্কার কাছে হুথি ড্রোন প্রতিহতের ঘটনাও সৌদি নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুরকি আল-মালকি বলেছেন, মক্কার নিরাপত্তা তাদের জন্য ‘রেড লাইন’।

ইয়েমেনের নতুন উত্তেজনা এখন ওয়াশিংটনের জন্যও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতির পর বাব আল-মান্দাব দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ওমানের রাজধানী মাসকাটে হুথি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

আলোচনায় হুথিরা যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করেছে বলে জানা গেছে যে সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়—এমন জাহাজ তাদের হামলার লক্ষ্য হবে না।

রিয়াদ ওয়াশিংটনের কাছে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের আহ্বান জানালেও যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত সরাসরি নতুন সামরিক ফ্রন্ট খোলার বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এর একটি বড় কারণ, ওয়াশিংটন একই সময়ে ইরানকে ঘিরে চলমান ব্যয়বহুল সংঘাতে জড়িয়ে আছে।

পরিস্থিতির অবনতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নও লোহিত সাগরে তাদের নৌ মিশন অপারেশন অ্যাসপিডিসের সতর্কতার মাত্রা বাড়িয়েছে।

ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বলেছেন, সৌদি আরবের ওপর হুথিদের হামলা গ্রহণযোগ্য নয় এবং এগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতির ক্ষতি করছে। তিনি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং আঞ্চলিক নৌ চলাচল পুনরুদ্ধারের বিষয়ে কথা বলেছেন।

বাব আল-মান্দাব লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। এ পথ দিয়ে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন হয়।

হুথিদের নিয়ন্ত্রণ পশ্চিম ইয়েমেনের উপকূলের দিকে যত বাড়ছে, এই সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও তত বাড়ছে। বিশেষ করে সৌদি জ্বালানি রপ্তানি ও লোহিত সাগরভিত্তিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়তে পারে।

ফলে ইয়েমেনের সাম্প্রতিক সংঘাত এখন শুধু সৌদি আরব ও হুথিদের দ্বিপক্ষীয় সামরিক লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত হিসাব, ইউরোপের নৌ নিরাপত্তা এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।