সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে আবারও জরুরি সতর্কতা। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ভোরে রিয়াদ ও আল-খারজে ন্যাশনাল আর্লি ওয়ার্নিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়। কিছু সময় পর সিভিল ডিফেন্স জানায়, বিপদ কেটে গেছে। তবে সতর্কতার কারণ কী ছিল, সেটি প্রকাশ করা হয়নি।
এর আগে শুক্রবার রাতেও জেদ্দা, তাইফ, ইয়ানবু, আলউলা, খামিস মুশাইত, জাজান ও আবহাসহ সৌদি আরবের একাধিক এলাকায় একই ধরনের সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। সেখানেও কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য হুমকির ধরন নির্দিষ্ট করেনি।
তাহলে প্রশ্ন উঠছে, কেন সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে, বিশেষ করে রিয়াদ ও আল-খারজে বারবার জরুরি সতর্কতা জারি হচ্ছে?
শনিবারের সতর্কতায় রিয়াদ ও আল-খারজের বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে থাকার, খোলা জায়গা এড়িয়ে চলার এবং জানালা, বারান্দা ও ছাদ থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। বাইরে থাকা ব্যক্তিদের নিকটবর্তী ভবনে আশ্রয় নেওয়া বা শক্ত কোনো আড়ালের পেছনে অবস্থান করতে বলা হয়।
পরে সিভিল ডিফেন্স জানায়, বিপদ কেটে গেছে। বাসিন্দাদের সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ, জমায়েত এড়িয়ে চলা এবং ঘটনাস্থলের ছবি বা ভিডিও না করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
অর্থাৎ এটি সাধারণ আবহাওয়া সতর্কতার ভাষা নয়; বরং এমন একটি সম্ভাব্য ঝুঁকির জন্য প্রস্তুত করা সতর্কতা, যার ক্ষেত্রে আকাশপথে বা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কোনো হুমকি থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ এখনো প্রকাশ্যে বলেনি যে সর্বশেষ সতর্কতাটি ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন নাকি অন্য কোনো হুমকির কারণে দেওয়া হয়েছিল।
রিয়াদের সর্বশেষ সতর্কতার সময়টি গুরুত্বপূর্ণ। ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের উত্তেজনা সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আবার বেড়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, ১৬ সেপ্টেম্বর সৌদি আরব মক্কার দক্ষিণে একটি হুথি ড্রোন শনাক্ত ও ধ্বংস করার কথা জানায়। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র দাবি করেন, ড্রোনটি মক্কার নিষিদ্ধ আকাশসীমার দিকে যাচ্ছিল। হুথিরা অবশ্য মক্কা বা কোনো ধর্মীয় স্থাপনা লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এর পরের দিনগুলোতেই সৌদি আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে একের পর এক নিরাপত্তা সতর্কতা জারি হতে দেখা যায়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বৃহস্পতিবার তাইফ প্রদেশে একটি হুথি ড্রোনকে বাধা দেওয়ার পর সেটির ধ্বংসাবশেষ পড়ে একজন নিহত ও দুজন আহত হওয়ার কথা সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। হুথিরা সৌদি বক্তব্যের কিছু অংশ অস্বীকার করেছে।
ফলে রিয়াদের নতুন সতর্কতাগুলোকে বৃহত্তর সৌদি-হুথি সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে দেখা হচ্ছে।
রিয়াদ শুধু সৌদি আরবের এটি দেশটির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। আর আল-খারজ রাজধানীর দক্ষিণে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক এলাকা।
এর আগে মার্চে ইরান-সৌদি সংঘাতের সময় আল-খারজ ও রিয়াদকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছিল। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, আল-খারজের প্রিন্স সুলতান এয়ার বেসের দিকে ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। রিয়াদেও একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহতের কথা জানিয়েছিল সৌদি কর্তৃপক্ষ।
অতীতের এই ঘটনাগুলো দেখায়, সৌদি কর্তৃপক্ষ রাজধানী ও তার আশপাশের আকাশসীমায় সম্ভাব্য হামলার ক্ষেত্রে আগাম সতর্কতা জারি করার ব্যবস্থা সক্রিয় রেখেছে।
তবে মার্চের হামলা ছিল ইরান-সম্পর্কিত বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। সেপ্টেম্বরের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো ইয়েমেনে যুদ্ধের নতুন তীব্রতা এবং হুথিদের সৌদি ভূখণ্ডে হামলার দাবি।
হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সমর্থক।
সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের সংঘাত আবার তীব্র হয়েছে। হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে হামলার অভিযোগ তুলে প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছেন বলে সৌদি ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
এদিকে হুথিরা লোহিত সাগরের উপকূলের বিস্তীর্ণ অংশ নিয়ন্ত্রণ করে এবং কৌশলগত বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছাকাছি তাদের উপস্থিতি রয়েছে। ফলে ইয়েমেনের স্থলযুদ্ধ এখন শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাত নয়; এটি সৌদি নিরাপত্তা, লোহিত সাগরের নৌপথ এবং আঞ্চলিক জ্বালানি পরিবহনের সঙ্গেও যুক্ত।
সৌদি আরবের National Early Warning Platform মূলত দ্রুত জনসতর্কতার ব্যবস্থা। কোনো সম্ভাব্য বিপদ শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় মোবাইল ফোনে সতর্কতা পাঠানো যায়।
এ ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—হুমকি নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষা না করে আগেই মানুষকে সতর্ক করা।
বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটের ব্যবধানও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ফলে কোনো আকাশপথের বস্তু শনাক্ত হওয়ার পর সেটি প্রতিহত করা হলে কিংবা হুমকি নিরসন হলে দ্রুত ‘danger passed’ ঘোষণা আসতে পারে।
এ কারণে একই রাতে সতর্কতা এবং পরে বিপদ কেটে যাওয়ার ঘোষণা, দুটিই পরস্পরবিরোধী নয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, ইয়েমেনের যুদ্ধ। সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা যত বাড়বে, সৌদি ভূখণ্ডে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কাও তত বাড়তে পারে।
দ্বিতীয়ত, সৌদি জ্বালানি অবকাঠামো। রিয়াদ ছাড়াও সৌদির পূর্বাঞ্চলের তেল ও গ্যাস স্থাপনাগুলো অতীতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্য হয়েছে। মার্চে সৌদি কর্তৃপক্ষ পূর্বাঞ্চলের একটি গ্যাস স্থাপনার দিকে যাওয়া একাধিক ড্রোন প্রতিহতের কথা জানিয়েছিল।
তৃতীয়ত, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব। হুথিদের সামরিক সক্ষমতা এবং ওই অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ বাড়লে সৌদি বন্দর, তেল পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে সতর্ক উত্তর হলো—রিয়াদে সরাসরি হামলা হয়েছে, এমন নিশ্চিত তথ্য সর্বশেষ সতর্কতার ক্ষেত্রে সৌদি কর্তৃপক্ষ দেয়নি।
তবে আঞ্চলিক পরিস্থিতি এমন যে রাজধানীর আকাশসীমায় সম্ভাব্য হুমকিকে সৌদি নিরাপত্তা কাঠামো অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধারাবাহিক সতর্কতা জারি হওয়া দেখাচ্ছে যে কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সক্রিয় রেখেছে।
রিয়াদের বারবার সতর্কতার পেছনে একটি নির্দিষ্ট ঘটনার বদলে বৃহত্তর আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনা, ইয়েমেনে হুথিদের সঙ্গে সংঘাত এবং সৌদি ভূখণ্ডের ওপর সম্ভাব্য ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
রিয়াদ ও আল-খারজে ফের বিপদসংকেত জারি
পূর্ব জেরুজালেমে ‘গ্যাস বোমা’ নিক্ষেপ করেছে ইসরায়েল
বাহরাইনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের যে নির্দেশনা দিলো দূতাবাস