শ্রীলঙ্কায় গণকবরের সন্ধান, মিললো ৫৭২ মানব কঙ্কাল

শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলীয় জাফনা উপদ্বীপের চেম্মানি এলাকায় শ্মশানের জমি সম্প্রসারণের কাজ করার সময় হঠাৎই একটি বিশালাকার গণকবরের সন্ধান পান শ্রমিকরা। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুর্ঘটনাবশত আবিষ্কৃত এই স্থানটিতে খননকাজ চালিয়ে চলতি বছরের আগস্ট নাগাদ ৫৭২ জন মানুষের কঙ্কাল ও হাড়গোড় উদ্ধার করেছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা।

উদ্ধার করা এসব অবশেষের মধ্যে শিশু ও দুধের শিশুদের কঙ্কালও রয়েছে। হাড়গোড়ের পাশাপাশি উদ্ধার করা হয়েছে নিহতদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র চুড়ি, স্কুলের ব্যাগ এবং দুধের বোতল। ধারণা করা হচ্ছে, এটি শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় গণকবর।

শ্রীলঙ্কায় ১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত চলা দীর্ঘ ২৬ বছরের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে প্রায় ১ লাখ মানুষ প্রাণ হারান এবং ২৩ হাজারের বেশি মানুষ (যাদের বেশির ভাগই তামিল) নিখোঁজ হন। ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে জাফনা উপদ্বীপ সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর চেম্মানি এলাকাটি উচ্চ-নিরাপত্তা অঞ্চল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। দীর্ঘদিন ধরে তামিলদের অভিযোগ ছিল, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাই হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে তুলে নিয়ে গিয়ে গুম ও হত্যা করেছে।

এর আগে ১৯৯৮ সালে এক তামিল ছাত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় দণ্ডিত এক সেনাসদস্য আদালতে স্বীকার করেছিলেন যে, চেম্মানিতে শত শত মানুষকে হত্যা করে পুঁতে রাখা হয়েছে। সে সময় ১০টির মতো কঙ্কাল উদ্ধার হলেও যুদ্ধ চলার কারণে তদন্ত আর এগোয়নি। এবার একই স্থানে ৫৭২টি কঙ্কাল মেলায় নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সাধারণ হিন্দু সৎকার পদ্ধতির সঙ্গে এই গণকবরের কোনো মিল নেই। বেশির ভাগ মরদেহে কোনো পোশাক ছিল না এবং সংকীর্ণ স্থানে মাত্র ১ থেকে ২ মিটার গভীরে শত শত লাশ গাদাগাদি করে ফেলে রাখা হয়েছিল। শ্রীলঙ্কার মানবাধিকার কমিশন জানিয়েছে, প্রাথমিক বিশ্লেষণে মনে হচ্ছে এটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের গণকবর।

উদ্ধার হওয়া সব কঙ্কাল জাফনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক বিভাগে রাখা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত শেষে সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে আদালতে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে সরকারের সদিচ্ছার অভাবের আশঙ্কায় এবং আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে বিচারপ্রার্থী তামিল পরিবারগুলো উত্তর শ্রীলঙ্কায় নতুন করে বিক্ষোভ শুরু করেছে।

যদিও অনুরা কুমার দিশানায়েকে সরকার ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও ডিএনএ পরীক্ষার আশ্বাস দিয়েছে, তবে কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থাকে তদন্তে যুক্ত করার দাবি তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো ও জাতিসংঘ এই গণকবরের সঠিক নিরপেক্ষ বিচারে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

সূত্র: বিবিসি।