ইয়েমেনে হুথিদের সঙ্গে তীব্র লড়াইয়ে বাড়ছে বাস্তুচ্যুতি

ইয়েমেনের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলে সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে তীব্র লড়াই অব্যাহত রয়েছে। তাইজসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে ভারী গোলাবর্ষণ, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। সংঘাতের তীব্রতা বাড়ায় তাইজে সতর্কতা জোরদার করে অতিরিক্ত নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। জনবসতিপূর্ণ এলাকাতেও হামলা ছড়িয়ে পড়ায় বেসামরিক মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে হচ্ছে। বিশেষ করে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

সাম্প্রতিক লড়াইয়ে কোনো পক্ষই বড় ধরনের ভূখণ্ডগত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।  চলমান সংঘাতে ড্রোনের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর দাবি, তারা একাধিক হুথি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। কিছু ড্রোনে মর্টার গোলা বহন করা হচ্ছিল বলেও সরকারি বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

এর আগে সেপ্টেম্বরের শুরুতেও ইয়েমেনি সামরিক বাহিনী জানিয়েছিল, হুথিরা তাইজ ও হোদেইদাহর পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ড্রোন ব্যবহার করেছে। সরকারি বাহিনীর দাবি, তাইজে কয়েকটি ড্রোন নতুনভাবে মোতায়েন করা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূপাতিত করা হয়েছিল। তবে ড্রোনে মর্টার বহনের নির্দিষ্ট দাবিটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল এখন চলমান সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্র। তাইজের পশ্চিমাঞ্চল, আল-মোখা এবং বাব আল-মান্দাবের কাছাকাছি এলাকাগুলোতে সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে লড়াই চলছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিরা লোহিত সাগর উপকূল বরাবর অগ্রসর হয়ে নতুন কিছু এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। আল জাজিরার ২২ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাইজের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সরকারি বাহিনী একটি হুথি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে। একই সঙ্গে তাইজের সামরিক কর্মকর্তারা কয়েকটি এলাকা পুনর্দখলের দাবি করলেও এসব যুদ্ধক্ষেত্রের দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে বেসামরিক মানুষের ওপর। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতে ইতোমধ্যে এক লাখের বেশি মানুষ দেশের ভেতরে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। আরও অনেকে সমুদ্রপথে জিবুতিতে পালিয়েছে। ২২ সেপ্টেম্বরের হিসাবে ইয়েমেনের বাস্তুচ্যুতদের ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সরকারি ইউনিট জানিয়েছে, চলতি মাসে আটটি গভর্নরেটে প্রায় ২৩ হাজার ৫৫০ পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। মোট বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৫৮ হাজার ছাড়িয়েছে বলে আল জাজিরা জানিয়েছে।

পশ্চিমাঞ্চলের অনেক এলাকায় যুদ্ধের কারণে ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, যোগাযোগব্যবস্থার বিঘ্ন, নিরাপত্তাহীনতা এবং চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে মানবিক সংস্থাগুলোর কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ইয়েমেনে ২০২২ সালের জাতিসংঘ-সমর্থিত যুদ্ধবিরতির পর বড় ধরনের সংঘাত অনেকটাই কমে এসেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে দেশটিতে আবারও একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ তীব্র হয়েছে।

তাইজ, আল-জাওফ, মারিব ও ধালেয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় সরকারি বাহিনী ও হুথিদের লড়াই চলছে। আল জাজিরার হিসাবে, ৬ আগস্ট থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলমান সংঘাতে অন্তত ৬৭৪ জন নিহত এবং প্রায় ৩ হাজার আহত হয়েছেন বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে। এই সংঘাতের সঙ্গে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা সরাসরি যুক্ত। কারণ বাব আল-মান্দাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। ফলে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব দেশটির মানবিক পরিস্থিতির পাশাপাশি আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচলের ওপরও পড়তে পারে।

বর্তমানে তাইজ ও পশ্চিম উপকূলে লড়াই অব্যাহত থাকলেও কোনো পক্ষের বড় ধরনের চূড়ান্ত অগ্রগতি নিশ্চিত নয়। তবে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি, জনবসতিতে হামলা এবং দ্রুত বাড়তে থাকা বাস্তুচ্যুতি ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।