যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে নিজেদের যুদ্ধ সক্ষমতা আরও বাড়াতে ‘বিশেষ পরিকল্পনা’ বাস্তবায়ন করছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস—আইআরজিসির স্থলবাহিনী। বুধবার আইআরজিসির সমন্বয়কারী উপ-কম্যান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ আখাভান এ তথ্য জানিয়েছেন।
ইরানি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আখাভান জানান, আইআরজিসির স্থলবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সরঞ্জাম ও অস্ত্রশস্ত্র আধুনিকায়নের কাজ চলছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মোতায়েন যুদ্ধ ইউনিটগুলোকে যেকোনো হামলার দ্রুত ও কার্যকর জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
আখাভানের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় আইআরজিসি বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে। কোনো হামলা হলে এর জবাব হবে ‘চূড়ান্ত ও কঠোর’—এমন সতর্কবার্তাও দিয়েছেন তিনি।
আইআরজিসির এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি সামরিক উত্তেজনাও অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আইআরজিসি একাধিকবার জানিয়েছে, নতুন করে হামলা হলে তাদের প্রতিক্রিয়ার ধরন আগের চেয়ে ভিন্ন হতে পারে।
আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি এর আগে বলেছিলেন, নতুন কোনো মার্কিন বা ইসরায়েলি হামলা হলে যুদ্ধের ভৌগোলিক পরিসর, ব্যবহৃত অস্ত্র এবং লক্ষ্যবস্তু—সবকিছুতেই পরিবর্তন আসতে পারে। তিনি আরও দাবি করেন, আইআরজিসি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জন্য প্রস্তুত।
আখাভানের বক্তব্যে অবশ্য নতুন কোনো অস্ত্রের নাম, মোতায়েনের স্থান বা নির্দিষ্ট সামরিক পরিকল্পনার বিবরণ দেওয়া হয়নি। তিনি মূলত যুদ্ধ ইউনিটগুলোর প্রস্তুতি এবং সরঞ্জাম আধুনিকায়নের ওপর জোর দিয়েছেন।
আইআরজিসির স্থলবাহিনী ইরানের সামরিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রচলিত স্থলযুদ্ধের পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, আর্টিলারি, সাঁজোয়া ইউনিট এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে এ বাহিনী পরিচালিত হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান তার সামরিক সক্ষমতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেশীয় প্রযুক্তি, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিভিন্ন ধরনের নির্ভুল অস্ত্র ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছে। আইআরজিসি বলছে, তাদের সামরিক সক্ষমতা ক্রমাগত বাড়ানো হচ্ছে এবং সম্ভাব্য দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্য বাহিনীকে প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তবে ইরানি কর্মকর্তাদের এসব সক্ষমতা ও প্রস্তুতি সম্পর্কিত অনেক দাবিই স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আইআরজিসির নতুন বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ইরান একই সময়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং সামরিক প্রস্তুতি দুটোই চালিয়ে যাচ্ছে।
নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে সাম্প্রতিক যোগাযোগের পরও আইআরজিসি জানিয়েছে, আলোচনার অর্থ সামরিক প্রস্তুতি বন্ধ করা নয়। আইআরজিসির মুখপাত্র মোহেব্বি বলেছেন, ইরানের জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন হলে যুদ্ধ এবং আলোচনার প্রক্রিয়া পাশাপাশি চলতে পারে। তাঁর ভাষায়, আলোচনা নিজেও এক ধরনের ‘যুদ্ধক্ষেত্র’।
অর্থাৎ, একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে; অন্যদিকে তেহরান সম্ভাব্য নতুন সামরিক সংঘাতের জন্য নিজেদের প্রস্তুত রাখার বার্তা দিচ্ছে।
গত কয়েক দিনে আইআরজিসির বক্তব্যে সম্ভাব্য নতুন হামলার ক্ষেত্রে আগের তুলনায় ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত বারবার এসেছে।
মোহেব্বি বলেছেন, নতুন হামলা হলে ইরান যুদ্ধের ভৌগোলিক পরিসর পরিবর্তন করতে পারে এবং নতুন অস্ত্র ও সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে। তিনি আরও দাবি করেছেন, আগের হামলায় যেসব লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়নি, ভবিষ্যতে সেগুলোর কিছু লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এসব বক্তব্যের নির্দিষ্ট সামরিক সক্ষমতা বা সম্ভাব্য লক্ষ্য সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রকাশ্যে নেই।
এদিকে আইআরজিসির পবিত্র প্রতিরক্ষা সপ্তাহ উপলক্ষে দেওয়া সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতেও বাহিনীটি নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং সম্ভাব্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জবাব দেওয়ার প্রস্তুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে।
আইআরজিসির এই সামরিক সতর্কবার্তা এমন সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সংঘাত কমানোর জন্য কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। নিউইয়র্কে দুই দেশের প্রতিনিধিদের যোগাযোগ এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে।
ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে তেহরানের অবস্থানে একই সঙ্গে দুটি বার্তা দেখা যাচ্ছে—কূটনৈতিক সমাধানের পথ পুরোপুরি বন্ধ নয়, তবে সম্ভাব্য নতুন হামলার ক্ষেত্রে সামরিক প্রস্তুতিও কমানো হচ্ছে না।
এই দ্বৈত অবস্থান আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আলোচনায় অগ্রগতি হলে সামরিক উত্তেজনা কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে; বিপরীতে আলোচনা ব্যর্থ হয়ে নতুন হামলা হলে আইআরজিসির সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারিগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত আইআরজিসির ‘বিশেষ পরিকল্পনা’র প্রকৃত পরিধি, নতুন সরঞ্জামের ধরন কিংবা এর বাস্তব সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।