চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই ওয়াশিংটনে আসছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরেই তাকে স্বাগত জানানোর পরিকল্পনা রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে শির জন্য থাকছে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা, সামরিক প্রদর্শনী ও রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ।
২৩ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বরের এই সফর এক দশকেরও বেশি সময় পর শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটন সফর। ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প ও শির মূল বৈঠক হওয়ার কথা। চলতি বছর এটি দুই নেতার দ্বিতীয় বৈঠক।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কোনো বিদেশি নেতাকে বিমানবন্দরে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানানো বিরল ঘটনা। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ এবং শির জন্য পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় আয়োজন দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান গুরুত্বকে তুলে ধরছে। সফরের অংশ হিসেবে রোজ গার্ডেনে সামরিক পর্যালোচনা এবং হোয়াইট হাউসে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজেরও আয়োজন করা হয়েছে।
ট্রাম্প-শি বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য সম্পর্ক। গত বছরের অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় দুই নেতার বৈঠকের পর দুই দেশ শুল্কযুদ্ধ কিছুটা কমাতে একটি বাণিজ্য সমঝোতায় পৌঁছেছিল।
সেই সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর নতুন করে বড় ধরনের শুল্ক বাড়ানোর কিছু পদক্ষেপ স্থগিত করে। পাল্টা হিসেবে চীন গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজ—রেয়ার আর্থ—রপ্তানির ওপর আরোপিত কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করার উদ্যোগ নেয়।
এই বাণিজ্যবিরতির মেয়াদ নভেম্বর মাসে শেষ হওয়ার কথা। ফলে ওয়াশিংটন বৈঠকে সেটি আরও বাড়ানো হবে কি না, সেটিই ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের অন্যতম প্রধান আগ্রহের বিষয়।
চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ভারসাম্যও আলোচনায় আসতে পারে। মার্কিন প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে চীনের সঙ্গে বড় বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে অভিযোগ করে আসছে। একই সময়ে বিরল খনিজের সরবরাহ নিয়েও ওয়াশিংটনের উদ্বেগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পে এসব খনিজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চীনের বিরল খনিজ সরবরাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয়। চীন বিশ্বের রেয়ার আর্থ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংশ্লিষ্ট সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ভূমিকা রাখে।
ওয়াশিংটন চাইছে চীন রেয়ার আর্থ রপ্তানি সহজ করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করুক। অন্যদিকে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে শুল্ক ও অন্যান্য বাণিজ্যিক বিধিনিষেধে ছাড় চায়। ফলে বিরল খনিজের প্রশ্নটি শুধু বাণিজ্য নয়, প্রযুক্তি ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্প ও শির বৈঠকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। বিশ্বের দুই বৃহৎ শক্তি এআই প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিযোগিতা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রে একদিকে এআইয়ের দ্রুত বিকাশকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে উন্নত এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে নিয়ন্ত্রণের দাবিও রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কর্মকর্তারা এআইসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত বিষয়ে আলোচনা করেছেন। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী হে লাইফেংয়ের সাম্প্রতিক বৈঠকেও বাণিজ্যের পাশাপাশি এআই নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তবে এআই বিষয়ে বড় কোনো চুক্তি এই সফরেই হবে কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রত্যাশা সীমিত।
চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি তাইওয়ান। বেইজিং তাইওয়ানকে নিজের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে ‘পুনরেকত্রীকরণের’ কথা বলে আসছে। অন্যদিকে তাইওয়ানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস তাইওয়ানের জন্য প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন করেছে, যা এখনো চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। চীন দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির বিরোধিতা করে আসছে।
বৈঠকের আগে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত শিয়ে ফেং বুধবার সতর্ক করে বলেছেন, তাইওয়ান, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারসহ কয়েকটি বিষয় চীনের ‘রেড লাইন’। তিনি বলেন, চীনের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন স্বার্থকে চ্যালেঞ্জ করা উচিত নয়।
ইরান প্রসঙ্গও উঠতে পারে
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতও ট্রাম্প-শি বৈঠকের আলোচনায় আসতে পারে। চীন ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং ইরানের অন্যতম প্রধান তেল ক্রেতা।
যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সময়ে চীনের ইরানি তেল কেনা কমানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে ইরান ইস্যুটি দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে উঠেছে।
চীন চাইলে ইরানের সঙ্গে তার সম্পর্ক ব্যবহার করে উত্তেজনা কমানোর জন্য তেহরানকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারে—এমন সম্ভাবনাও বিশ্লেষকেরা তুলে ধরেছেন। তবে ওয়াশিংটন ও বেইজিং এ বিষয়ে কতটা সমন্বয়ে যেতে পারে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
শির সফরকে ঘিরে হোয়াইট হাউসের আয়োজনের জাঁকজমক নজর কাড়লেও বৈঠক থেকে বড় ধরনের চুক্তির প্রত্যাশা তুলনামূলকভাবে সীমিত।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যবিরতি আরও কিছু সময় ধরে রাখার বিষয়টি বৈঠকের অন্যতম বাস্তবসম্মত ফল হতে পারে। একই সঙ্গে রেয়ার আর্থ, সরবরাহব্যবস্থা, এআই, তাইওয়ান ও ইরান—এসব জটিল ইস্যুতে দুই নেতার মধ্যে মতপার্থক্য থেকেই যেতে পারে।
তারপরও ট্রাম্প ও শির ব্যক্তিগত যোগাযোগকে দুই দেশের সম্পর্ক ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। নিয়মিত শীর্ষ বৈঠকের মাধ্যমে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ইস্যুতে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ফলে ওয়াশিংটনে শির এই রাষ্ট্রীয় সফরের তাৎপর্য শুধু একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফরে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতি ও সামরিক শক্তির নেতাদের বৈঠকটি একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্য, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা, তাইওয়ান, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরানকে ধ্বংসের হুমকি দিয়ে পেজেশকিয়ানকে বশে আনতে চাইছেন ট্রাম্প
ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্যাসক্ষেত্র উৎপাদনে ফিরেছে: ইরান
ট্রাম্পের হুমকির পরই নিউইয়র্কে মার্কিন-ইরানি কর্মকর্তাদের বৈঠক