ইরানের প্রস্তাব ছিল সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে, একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিকসহ বৃহত্তর শান্তি আলোচনা আবার শুরু হবে। বিনিময়ে ওয়াশিংটনকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা প্রত্যাহার এবং যুদ্ধবিরতির মতো কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।
প্রশ্ন হলো- বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ দ্রুত স্বাভাবিক করার সুযোগ সামনে থাকার পরও ট্রাম্প কেন এতে সম্মত হলেন না?
এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, ওয়াশিংটনের কাছে এখন হরমুজ আর আগের মতো পুরোপুরি ইরানের হাতে থাকা একটি ‘অচলাবস্থার অস্ত্র’ নয়। কয়েক মাসের সামরিক তৎপরতা, বাণিজ্যিক জাহাজকে এসকর্ট এবং বিকল্প সরবরাহপথ তৈরির প্রচেষ্টার ফলে যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, প্রণালিতে ঝুঁকি থাকলেও সেটি আংশিকভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য হয়ে উঠেছে।
হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যে সংযোগ তৈরি করেছে। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের বড় একটি অংশ এই সরু জলপথের ওপর নির্ভরশীল। তাই হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু ইরান বা উপসাগরীয় দেশগুলো নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও তার প্রভাব পড়ে। তেলের দাম, জাহাজের বিমা, পরিবহন ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে এই ভূগোলগত সুবিধাকে কৌশলগত চাপ তৈরির উপায় হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। চলমান সংঘাতেও তেহরান হরমুজকে তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে দেখিয়েছে।
কিন্তু এখন পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের দাবি, গত কয়েক মাসে মার্কিন বাহিনীর সহায়তায় ২ হাজারের বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করেছে এবং এর মাধ্যমে এক বিলিয়নের বেশি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন হয়েছে। অর্থাৎ হরমুজ দিয়ে স্বাভাবিক সময়ের মতো বাণিজ্য চলছে না, কিন্তু প্রণালিটি সম্পূর্ণ অচলও হয়ে যায়নি। এই বাস্তবতা ওয়াশিংটনের হিসাব বদলে দিতে পারে।
ইরানের উদ্দেশ্য যদি হয় হরমুজের ওপর নিয়ন্ত্রণ বা বাধা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে দ্রুত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ছাড় দিতে বাধ্য করা, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এখন দেখাতে পারছে যে সামরিক এসকর্ট, বিকল্প রুট এবং আঞ্চলিক অবকাঠামোর মাধ্যমে অন্তত কিছু পরিমাণে সেই চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব।
রয়টার্সও জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনী হরমুজ দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহন বৃদ্ধির কথা বললেও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের তথ্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল হিসেবে দেখাচ্ছে। অর্থাৎ মার্কিন দাবি এবং স্বাধীন শিপিং ডেটার মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে।
ইরানের প্রস্তাবটি ছিল একটি বিনিময়ভিত্তিক চুক্তি। তেহরান হরমুজ খুলবে, কিন্তু বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে।
এর মধ্যে ছিল- ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া; ইরানের তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা প্রত্যাহার; যুদ্ধবিরতি; লেবাননসহ বিস্তৃত অঞ্চলে সামরিক সংঘাত বন্ধের ব্যবস্থা; এরপর পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনা পুনরায় শুরু। অর্থাৎ হরমুজ খুলে দেওয়ার বিষয়টি ইরানকে শুধু একটি নৌপথের নিয়ন্ত্রণ ছাড়ার প্রশ্ন হিসেবে দেখছে না; বরং এর বিনিময়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ছাড় চাচ্ছে।
ট্রাম্পের প্রকাশ্য বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তিনি মনে করছেন ইরান এখন চাপের মধ্যে রয়েছে। ট্রাম্প বলেছেন, ইরান দ্রুত হরমুজ খুলে দেওয়ার বিনিময়ে চুক্তি করতে চাইছে এবং তিনি প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত হিসাব হতে পারে- যদি সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ ইতোমধ্যে তেহরানের ওপর প্রভাব ফেলছে, তাহলে এখনই বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
হরমুজের বিকল্প তৈরির চেষ্টা
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমানোর পথ খুঁজছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প পাইপলাইন ও বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে তেল পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। একই সময়ে ওয়াশিংটনও উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামো পুনর্গঠন ও হরমুজ এড়িয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করছে।
এ ধরনের উদ্যোগ সফল হলে হরমুজকে ঘিরে ইরানের কৌশলগত প্রভাব কিছুটা কমতে পারে। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে হরমুজের গুরুত্ব শেষ হয়ে গেছে। বরং জলপথটির গুরুত্ব এত বেশি যে এর দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা এখনো বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি।
ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান মানেই কূটনীতি শেষ নয়
ট্রাম্প প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে এমনটি বলা যাচ্ছে না। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে চলতি সপ্তাহে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক ঘণ্টা পরোক্ষ আলোচনা হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এর আগে এসব আলোচনাকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেছিলেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও জানিয়েছেন, তেহরান এখনো মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে ট্রাম্পের প্রকাশ্য ‘না’কে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ সমাপ্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
কে কতটা সময় অপেক্ষা করতে পারবে?
হরমুজ নিয়ে বর্তমান অচলাবস্থার কেন্দ্রবিন্দু আসলে সময়। ইরান চাইছে হরমুজকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে দ্রুত আলোচনায় এবং ছাড়ের দিকে নিয়ে আসতে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হতে পারে সামরিক চাপ ও বিকল্প সরবরাহপথের মাধ্যমে তেহরানের সেই দর-কষাকষির ক্ষমতা কমিয়ে আনা।
যতো বেশি সময় যুক্তরাষ্ট্র হরমুজের সীমিত বাণিজ্যিক চলাচল বজায় রাখতে পারে, ততো বেশি ওয়াশিংটনের ওপর তেহরানের তাৎক্ষণিক চাপ কমতে পারে। বিপরীতে, যদি জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়ে, জাহাজ চলাচল আরও কমে যায় এবং তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ থাকে, তাহলে হরমুজ আবারও ইরানের জন্য শক্তিশালী কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানকে শুধু ‘চুক্তি প্রত্যাখ্যান’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এর মধ্যে রয়েছে দর-কষাকষির ক্ষমতা, সময়ের হিসাব এবং হরমুজের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর, সে বিষয়ে ওয়াশিংটনের পরিবর্তিত মূল্যায়ন।
শেষ পর্যন্ত হরমুজ কে খুলবে, কখন খুলবে এবং কী শর্তে খুলবে তা শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের গতিপথেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।